Main Menu

ভাল নেই গোবিন্দগঞ্জের বালু দস্যূরা!

গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি:‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরি’ চর্যাপদের সেই বিখ্যাত পংক্তির অর্থ সবারই জানা। আর যারা পড়েছেন ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ তারা বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন। হাস্যরসাত্মক ‘বিড়াল’ আর আফিমখোর কমলাকান্তের যুক্তিতর্কে তৎকালীন সমাজ বাস্তবতা আর সম্প্রতি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় শত শত বালু দস্যূদের পক্ষের খবর শিরোনামে অবশ্যই ভালো নেই গোবিন্দগঞ্জের বালু দস্যূরা। দেশের আইন অমান্য করে, সরকারের দলীয় নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আর সমাজের দর্পণদের পাশ কাটিয়ে গাঁ বাঁচানোর চেষ্টাতেও বালু দস্যূদের চলছে দূর্দিন; এখন তারা একলা চল নীতি অবলম্বন করেছেন বলে জানা গেছে ।
বিভিন্ন সময় সরেজমিন সূত্রে জানা গেছে, সরকার দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে; সেখানে বালুর প্রয়োজন! ‘বালুমহাল’ করে টেন্ডার ব্যবস্থায় সরকার লাভবান হতে পারে প্রসঙ্গে; এটা বাস্তবায়নে সময়ের প্রয়োজন! নদীর গর্ভ হতে বালু উত্তোলনে- পানি উন্নয়নবোর্ডের নদী খননের কাজটি হয়ে যাচ্ছে! আঞ্চলিক সড়কগুলো ঠিকাদাররা ঠিকমত রোলার না করায় দশ চাকার আটশ’ সেপটি বালু বোঝাই ড্রাম ট্রাক দিয়ে সেই কাজটি করে দিচ্ছে! সড়কের পুরাতন ব্রীজগুলো সংস্কারহীন হওয়ায় নড়বড়ে করে নতুন করার ব্যবস্থা হচ্ছে! বালুর বেড করায় নদী তীরবর্তী একফসলী জমিতে প্রতি মাসে শতক প্রতি এক থেকে দেড়হাজার টাকা আয়ের ব্যবস্থা হয়েছে ভ‚মি মালিকদের! সামাজিক ব্যধিতে আক্রান্ত বখাটেরা দৈনিক আয়ের পথ পেয়েছে! সবশেষে উপজেলায় গোবরে পদ্মফুল সদৃশ্য লাখ আর রাজনৈতিক নেতাদের কোটিপতি বৃদ্ধির হার বেড়েছে!
এমন অবস্থায়, উপজেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা নিরালসভাবে অভিযান পরিচালনা করে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত মেশিন ধ্বংস করছে; টাকার সমস্যা না থাকায় পরদিনই আবার নতুন মেশিনে বালু উত্তোলন করছে। এতে করে বালু উত্তোলন করার মেশিন বিক্রি বেড়ে গেছে। ছোট ও পুরাতন মেশিন ধ্বংস করায় বড় ড্রেজার (বাস-কোচ-ট্রাকের ৬ সিলিন্ডারের ডিজেল ইঞ্জিন) ক্রয়ের অতিরিক্ত টাকা খরচ হওয়া, মামলার ভয়, বিভিন্ন পর্যায়ে দলগতভাবে দিলেও বর্তমানে একক ভাবে উৎকোচ প্রদানের ব্যবস্থা, নানা প্রশ্নের মুখে বালু ব্যবস্যা হতে রাজনৈতিক নেতারা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় গোবিন্দগঞ্জের বালু দস্যূরা একলা চল নীতি অবলম্বন করতে বাধ্য হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী বিভিন্নস্তরের কর্তাদের দৌরাত্ব ও সমাজের দর্পণদের দিন-রাত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ায় অস্থির করা প্রচারণায় সত্যিকার অর্থে ভাল নেই গোবিন্দগঞ্জের বালু দস্যূরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ধর্মপুরের এক বালুদস্যূ চৌধুরী সাহেব তার কৌশলী বক্তব্যে জানান, আমি ধর্মপুরে প্রথম নদীর চর থেকে ২০ লক্ষ সেপটি বালু উত্তোলন করে তা বিক্রি করেছি। সেই সাথে পানি উন্নয়ন বোর্ডে নদী খননের জন্য একটি প্রকল্প তৈরি করে পাঠিয়েছিলাম। যদি প্রকল্পটি পেতাম তা হলে প্রকল্পের অর্থে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে অনেক লাভ হত। কিন্তু সেটি না করতে পারায় আর বালু তুলছি না। একই এলাকার অপর এক বালু ব্যবস্যায়ী জানান, প্রতি সেপটি বালু উত্তোলনে জমি ভাড়া-লেবার-মেশিনসহ খরচ পড়ে এক টাকা ত্রিশ পয়সা। বালু বিক্রিতে দালালদের দিতে হয় পঞ্চাশ পয়সা। কিন্তু প্রতি সেপটি বালু বিক্রি করতে হচ্ছে দুই টাকা আশি পয়সা। এতে করে লাভ হচ্ছে ১ টাকা যাতে বিভিন্ন পর্যায়ে উৎকোচ দিয়ে আমরা সুখি নই। অনেকের অবশ্য প্রতি সেপটি বালুতে লাভ হচ্ছে ১ টাকা পঞ্চাশ পয়সা। মাত্র কয়েক দিনেই প্রায় কয়েক লক্ষ বালু উত্তোলন করছে এবং নিমিষেই তা বিক্রি হওয়ায় অজানা শঙ্কা মাথায় নিয়েই তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক বন্যা। বন্যায় পানির ¯্রােতে বালু বেডের বালু ধ্বসে যাচ্ছে এবং বেডের চারপাশে পানি থাকায় বালু বিক্রি করতে না পারায় অনেকটা দূরাবস্থায় রয়েছে বালু ব্যবসায়ীরা।
চকরহিমাপুর, কাটাখালী বালুয়া, ফুলবাড়ি, সমসপাড়া, পৌরসভার মধ্যে খলসী, রায়দের বাড়ির পেছনে, ধর্মপুর-কাজলা, বড়দহ সেতু এলাকা, ধুন্দিয়া, মহিমাগঞ্জসহ করতোয়া নদীর প্রায় পঞ্চাশটি পয়েন্টে শতাধিক ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। আইন প্রয়োগে অভিযোগ আর মামলায় গড়িমসির কারণে এবং স্থানীয় ইউনিয়ন তহশিলদারদের খামখেয়ালীপনায় এ উৎসব বন্ধ কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে গোবিন্দগঞ্জের সচেতনমহলসহ গোবিন্দগঞ্জ নাগরিক কমিটির আহবায়ক এম.এ মোতিন মোল্লা বলেন, গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া-কাটাখালী নদীর বালু পাশ^বর্তী দিনাজপুর, বগুড়া ও রংপুরে রপ্তানি করায় বেশ সুখেই রয়েছে এ উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তা ও বালু দস্যূরা। মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারের পরও থামছে না বালু দস্যূরা। তাই আমরা হাইকোর্টে রিট করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। অভিযোগ-অভিযান-মিডিয়ায় প্রচার আর মানববন্ধনের মত কর্মসূচিতে সচেতন নাগরিক সমাজ ক্লান্ত হওয়ায় এবং প্রতিবাদের হাল না ছাড়ায় এককথায় ভালো নেই গোবিন্দগঞ্জের বালু দস্যূরা।
নিজের শরীরের মাংস সুস্বাদু হওয়ায় হরিণকে শিকারীর তীরে আহত হতে হয়। সেদিক থেকে বালু দস্যূদের বালুর বেডই পড়েছে নদী ভাঙনের কবলে। আর ‘বিড়াল ও কমলাকান্তের’ যুক্তিতর্কে পেটের দায়ে চোরকে সাজা দিতে বিচারককে তিন দিন অভুক্ত থেকে রায় প্রদান করার মত এ উপজেলার কর্তাদেরও কষ্ট করতে হতে পারে। তাই বন্ধ হচ্ছে না বালু উত্তোলন ও পার্শ্ববর্তী জেলায় রপ্তানি। গাইবান্ধা জেলা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অবসান হোক বালু উত্তোলন ও বালু দস্যূদের দৌরাত্ব এমনটাই সকলের কামনা।






Related News

Comments are Closed