Main Menu

গোবিন্দগঞ্জে কর্মসংস্থানে সহায়তা না পেয়ে ঘর ছাড়ছে পুনর্বাসিত পরিবার

শেখ মামুন হাসান (গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি) : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বিভিন্ন আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের বাস্তবতা বড়ই নির্মম। জীবন ও জীবিকার কোন উপায় না পেয়ে বসবাসে অনীহায় ঘর ছেড়েছে প্রায় অর্ধেক পুনর্বাসিত পরিবার। দারিদ্র বিমোচনের অন্যতম এ প্রকল্পে অনেকে আশায় ঘর বাধলেও সেই দারিদ্রতাকে কাটাতে না পারায় গৃহহীন মানুষগুলো আবারো নিরুদ্দেশে বাধ্য হচ্ছে। ব্যারাকে ভ‚মিহীন পরিবার পুনর্বাসন; প্রকল্পগ্রামে সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণ; আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ ও ঋণ প্রদান; কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ; ব্যারাক মেরামত; বৃক্ষরোপণ; বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান ইত্যাদি সেবাসমূহের অগ্রাধিকার থাকলেও ভূমি-বসত-কর্মহীন দরিদ্র এ মানুষগুলো চরম অসহায়ত্বে দিন কাটাচ্ছে। নতুন ঘর পেয়ে অনেক স্বপ্নের বুননে রাত যেনো তাদের ভোর হচ্ছে না। সেই সব দরিদ্র মানুষদের নিয়ে প্রতিবেদনে আজ থাকছে কাটাবাড়ী ইউনিয়নে অবস্থিত ফুলহার-১, ২ (গুচ্ছগ্রাম-১, ২) ও বোগদহ প্রকল্পে পুনর্বাসিত জীবন বাস্তবতা।
কাটাবাড়ী ইউনিয়নের ফুলহার ১ (হস্তান্তর তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০১৯) ও ফুলহার-২ (হস্তান্তর তারিখ ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮) নামে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পে দরিদ্র প্রায় ৬০টি করে মোট ১২০টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। সরেজমিনে সেখানে ১৫ থেকে ২০টি পরিবারকে বসবাস করতে দেখা গেছে। অবশিষ্ট ঘরগুলো তালা-ঝুলানো। বসবাসকারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জীবন ও জীবিকায় কোন সহায়তা না পাওয়ায় এরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ফেরারি জীবন যাপন করছে। কেউবা পাশর্^বর্তী গ্রামে পূর্ব হতেই বসবাস করছে। আবার কেউ ঘর বরাদ্দ নিলেও নন ভ‚মি বা গৃহহীন। আশে পাশের গ্রামগুলোতেই তারা বসবাস করেন। করোনা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় ১ বস্তা করে চাল বরাদ্দের সময় কেউ কেউ আসলেও ঐ দিনই আবার চেলে গেছে। অনেকে ঐ চালও নিতে আসেনি। আবারও কোনো সাহায্য সহযোগিতার খবর পেলে হয়ত তারা আসবে এবং বসবাস শুরু করবে।
ফুলহার-১ ও ফুলহার-২ আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের মাঝেই একই সীমানায় রয়েছে আরো দুটি আশ্রয়কেন্দ্র। বসবাসকারীরা যেটাকে গুচ্ছগ্রাম-১ ও গুচ্ছগ্রাম-২ নামে অভিহিত করে থাকেন। ঐ দুটিতে প্রথম দিকে ১’শ পরিবার বসবাস শুরু করলেও বর্তমানে সেখানে রয়েছে ৭০ থেকে ৭৫টি পরিবার। কেউ ২ আবার কেউ প্রায় ৩ বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন। গুচ্ছগ্রাম আখ্যায়িত অনেক ব্যারকই রয়েছে খালি। টিনের বেড়া আর মেঝের মাঝে রয়েছে ফাঁকা প্রায় ২-৩ফুট। অর্থাৎ আজও এই ঘরগুলোর মেঝেতে ফেলানো হয়নি মাঠি বা বালি। প্রতিবেশিরা সেখানে খড়-কুটা ভরে রেখেছে। তবে এ ৪টি প্রকল্পে কোথাও নামকরণ সাইনবোর্ড না থাকায় গুচ্ছগ্রাম-১, ২ এবং আশ্রয়ণ কেন্দ্র ফুলহার-১, ২ নামে আলাদা করার কোনো উপায় নেই। যদিও সরকারি বরাদ্দে লেখা হয় ফুলহার-১, ফুলহার-২ ইত্যাদি।
এই চারটি প্রকল্প গ্রামে সুপেয় পানির ব্যবস্থা থাকলেও তাতে যেমন পিপাসা মেটানো দায়; তেমনি গোসল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য বেশ দূরে অবস্থিত নদীই তাদের একমাত্র অবলম্বন। কিছু কিছু বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও অনেক সংযোগই এখনও চালু হয়নি। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে দূর্বল হয়ে পড়ছে। টিন ও কাঠের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে এগুচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় পাড় ধ্বসে যাচ্ছে। খড়া মৌসুমে খা-খা রোদে ঘরে ও বাহিরে অবস্থান কষ্টকর। প্রতি বছর নতুন নতুন বৃক্ষরোপণ না করায় নদীর বালিতে ভরাট পুরো এলাকা মরুভ‚মি সদৃশ্য। প্রকল্প এলাকা সংলগ্ন অনেক খাস জমি থাকলেও পূর্ব হতে দখলভোগকারী প্রভাবশালীরা এখনও তা ভোগ করছেন।
গত জুনের মাঝামাঝি এখানে শুরু হয়েছে আরো একটি আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের কাজ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সার্বিক তত্ত¡াবধানে স্ক্যাপিটার দিয়ে প্রকল্প সীমানায় নদীর বালি আটকিয়ে উঁচু করার জন্য বেরি বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে। প্রকল্প সীমানার মাঝ থেকে পলি মাটি যন্ত্রের সাহায্যে উঠিয়ে এ বাঁধ তৈরির কাজ প্রায় সম্পন্ন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলে চলতি অস্থায়ী বন্যায় এখানকার কাটাখালী নামক নদী ভরাট থাকায় ভ‚-গর্ভস্থ বালি উত্তোলনে ড্রেজার মেশিন স্থাপন করতে না পারায় বালি বালি ভরাটের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। তবে সরেজমিনে ব্যারাক নির্মাণের প্রয়োজনীয় অ্যাঙ্গেল ও রড ঝালাইয়ের কাজ পুরোদমে চলছে। প্রকল্পের পাশ^বর্তী গ্রামের দুইজনসহ নীলফামারি ও ডোমার উপজেলার কয়েকজন শ্রমিক ৩৫০, ৫০০, ৭০০ এবং হাজার টাকায় ডে পেমেন্টের মাধ্যমে চলা একাজ আগামী মাসের শেষ দিকে সম্পন্ন হবে বলে জানান প্রধান কারিগর। চারটি প্রকল্পের বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা প্রায় আড়াইশ’ হলেও বর্তমানে সেখানে বসবাস করছে ৭০টি পরিবার। তার পরেও একই স্থানে পঞ্চম প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে।
গত ১ জুলাই ফুলহার ১,২,৩ ও ৪ নং প্রকল্প গ্রামে সরেজমিনে কথা হয় প্রকল্পে বসবাসকারী একাধিক নারী ও পুরুষের সাথে। কথা হয় স্থানীয় ৩নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্যর সাথে। প্রকল্পে বসবাসকারী আ. খালেক জানান, ২০১৮ সালে বিআরডিবি হতে আমাদের ১’শ পরিবারকে প্রশিক্ষণ দেয়। তবে কোনো সমবায় সমিতি এখানে চালু করা হয়নি। দেয়া হয়নি কোনো ঋণ। ৩দিনের প্রশিক্ষণ হলেও ট্রেড বৈচিত্র্যে দেয়া হয়নি ১৪ দিনের কোনো প্রশিক্ষণ। এমনকি পঞ্চম প্রকল্প চালুর পূর্বে এখানে পরিদর্শণে আসেননি ডিসি, এডিসি, ইউএনও, এসিল্যান্ড ও সমবায় কর্মকর্তা। তবে একবার সমবায় না বিআরডিবির একজন এসেছিল।
এখানকার চালু আশ্রয়ণ কেন্দ্রগুলোতে বিগত সময়ে লাগানো হয়নি কোনো নতুন নারিকেল, সুপারি, ফলদ বা বনজ বৃক্ষ। গাছে ঝুলে থাকা যে আম দেখছেন তা তিন বছর পূর্বে প্রকল্প তৈরির সময় লাগানো ছিল বলে উপস্থিত ইউপি সদস্য জানান, এই গুচ্ছগ্রাম বা আশ্রয়ণ কেন্দ্রগুলোতে বসবাসকারীদের পেশাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। সঞ্চয়ের আগ্রহ সৃষ্টি করাতো দূরের কথা দক্ষ জনশক্তি ও সাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলে নেতৃত্ব, ক্ষমতায়ন, আত্মকর্মসংস্থান, সামাজিক ও শিশুদের প্রতিরোধযোগ্য রোগব্যাধি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো সহযোগিতা এরা পায় নাই। বর্ষার সময় প্রায় দেড় কিলোমিটার সংস্কারহীন কাচা রাস্তা দিয়ে আড়াই কিলোমিটার দূরের বাজার-ঘাটে দুবির্ষহ জীবন যাপন প্রকল্প এলাকায় বসবাসকারীদের। তাই এখানকার পরিবারগুলোর অর্ধেকের বেশি ঘরে শুধু তালাই ঝুলছে।
প্রতিটি প্রকল্পে একটি করে কমিউনিটি সেন্টার আমাদের আশা জাগালেও শিশু শিক্ষায় এখানে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রকল্পের আশে পাশে নেই কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়। সরকারি খাস জায়গা থাকলেও মৎস্যচাষে উদ্বুদ্ধ করতে নেই কোন পুকুর। সবজি বাগান বা সামাজিক বনায়নে নেই কোন উদ্যোগ।
এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে গত ০৪ ফেব্রæয়ারি ২০২০ মোঃ মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত ০৩.০২.০০০০.৭০১.০২.০৯৬.১৯-১৫১৩ এক পত্রে ফুলহার-১ প্রকল্পে ৬০টি পুনর্বাসিত পরিবারের মাঝে ২৯হাজার ৪’শ টাকার বিপরীতে ৬০টি নারিকেল, ১২০টি সুপারি ও ৭২০টি ফলদ ও বনজ বৃক্ষ রোপণ, ফুলহার-২ প্রকল্পেও অনুরূপ বরাদ্দ দেয়া হয় এবং বোগদহ প্রকল্পে ৭০টি পুনর্বাসিত পরিবারের মাঝে ৩৪হাজার ৩’শ টাকার বিপরীতে প্রতিটি পরিবারের মাঝে ৭০টি নারিকেল, ১৪০টি সুপারি ও ৮৪০টি ফলদ ও বনজ বৃক্ষ রোপণের বরাদ্দ থাকলেও এ তিনটি প্রকল্পে তা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। উক্ত বরাদ্দ পত্রে যদিও বৃক্ষরোপণের সচিত্র তথ্যসহ বন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্তৃক স্বাক্ষরিত বিস্তারিত ব্যয় বিবরণী গত ৩০ জুন ২০২০ এর পূর্বে প্রেরণের কথা ছিল।
অপরদিকে গত ১৮ মে ২০২০ তারিখে মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত ০৩.০২.০০০০.৭০১.০২.০৯৬.১৯-৪৩২ এক পত্রে ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদিত “আশ্রয়ণ-২ (দারিদ্র বিমোচন ও পুনর্বাসন)” শীর্ষক প্রকল্প গ্রান্ট নং-০২ কোড নং-১০৩০১০২-২২৪০০০৬০০-৭২১৫২০৬ হতে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পে পুনর্বাসিতদের ঋণ প্রদানকল্পে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুকূলে ফুলহার-১ এ ১২টি ব্যারাকের ৬০টি পুনর্বাসিত পরিবারের মাঝে ঋণ বরাদ্দের উদ্দেশ্যে ১৮ লক্ষ টাকা; একই পত্রে ও উদ্দেশ্যে ফুলহার-২তে অনুরূপ ১২ ব্যারাকে পুনর্বাসিত ৬০টি পরিবারের মাঝে ঋণ বরাদ্দের উদ্দেশ্যে ১৮ লক্ষ টাকা এবং বোগদহ প্রকল্পে (১৪টি ব্যারাকের ৭০টি পরিবারের মাঝে যা ০৪/০৭/২০১৯ তারিখে হস্তান্তরিত) পুনর্বাসিত ৭০টি পরিবারের মাঝে ঋণ বরাদ্দের উদ্দেশ্যে ২১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। যা দ্রæত কার্যকরে উপজেলা কমিটির সমন্বয়ে বাস্তবায়িত হবে বলে জানা গেছে। ঘূর্ণয়মান এই অর্থ বিতরণে পুনর্বাসিতদের জীবন ও জীবিকার অনেকটাই সুফল বয়ে আনবে বলে অনেকের আশা। যদিও এখনো দেয়া হয়নি প্রশিক্ষণ; গঠন করা হয়নি সমবায় সমিতি।
উল্লেখ্য, বোগদহ প্রকল্পে ১জুন ২০২০ মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত ০৩.০২.০০০০.৭০১.০২. ০৯৬৩১৯-৫১০ পত্রে একটি কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ ব্যয় নির্বাহের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুকূলে ৯লক্ষ ৮০ হাজার ১’শ ১৩ দশমিক ৪ টাকা অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গত ১জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উক্ত প্রকল্প স্থান পরিদর্শন শেষে কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের স্থান নির্দিষ্ট করেছেন বলে জানান প্রকল্পে বসবাসকারীরা। এ কাজটি নির্মাণের শেষ তারিখ ছিল ৩০ জুন ২০২০।






Related News

Comments are Closed