Main Menu

সাংবাদিক নির্যাতন : কিসের আলামত?

 মীর আব্দুল আলীম= কুড়িগ্রাম অনিয়ম-দুর্নীতির খবর প্রকাশের জের ১৪ মার্চ মধ্যরাতে তুলে নিয়ে
সাংবাদিককে নির্যাতন ও ফাঁসানো হয় মাদক মামলায়। গত ৯ মার্চ ভুয়া খবর
প্রকাশের অভিযোগে মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীসহ অন্য ৩২ জনের
বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের মাগুরা-১ আসনের
ক্ষমতাসীন দলের এমপি সাইফুজ্জামান শিখর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে এম
মামলাটি করেন। মামলা দায়েরের পর ১০ মার্চ থেকে নিখোঁজ রয়েছেন ঐ মামলার
৩নং আসামী সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল। রাজধানী ঢাকার লালবাগের বাস থেকে
বের হয়ে তিনি আর ফিরে আসেননি। এগুলো কিসের আলামত?
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে প্রথম থেকেই কালো আইন হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছেন
সাংবাদিক সমাজ। এই আইনে সাংবাদিকদের কোনো হয়রানি করা হবে না বলে সরকারের
পক্ষ থেকে বলা হলেও একের পর এক সাংবাদিক হয়রানীর শিকার হচ্ছেন। মামলা
দিয়ে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মানবজমিন সম্পাদকের
বিরুদ্ধে যিনি মামলা করেছেন তার বিরুদ্ধে ওই পত্রিকায় নাম উল্লেখ করে বা
আকার-ইঙ্গিতে কোনো খবর প্রকাশ করা হয়নি। অথচ তিনি অযাচিতভাবে মতিউর রহমান
চৌধুরীসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে ইল্লেখ করে সাংবাদিক নেতা
এবং সংবাদপত্র সম্পাদক পরিষদ অবিলম্বে এ মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
যুগেযুগে সাংবাদপত্র আর সাংবাদিকদের কন্ঠরোধের ইতিহাস আছে। আয়নায় যখন
আমরা নিজেদের মুখ দেখি, তখন ভেসে ওঠে ভিন্ন ছবি! সে ছবি উজ্জ্বল নয়, নয়
দৃষ্টিনন্দন। এ ছবি অনেকটা মসিলিপ্ত, অসম্পূর্ণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে
কলুষিত, কুৎসিত। আমরা সব সময়ই গণতন্ত্রের কথায় উচ্চকণ্ঠ হই, স্বাধীনতার
প্রশ্নে হ্যাঁ বলি, কিন্তু সংবাদপত্র কিংবা বাস্তবে সম্প্রচারমাধ্যমকে
খুব বেশি মর্যাদা দিই না কখনোই। আমরা গণঅধিকারের দাবিতে সোচ্চার হই,
কিন্তু গণঅধিকারের রক্ষাকবচ যে গণমাধ্যম তথা সংবাদমাধ্যম, তার স্বাধীনতা
নিশ্চিত করতে কুণ্ঠাবোধ করি। সাংবাদিকদের যথার্থ মর্যাদা দেয়ার পাঠ এখনো
আমরা গ্রহণ করিনি, এমনকি করার উচ্ছাও নেই বোধ করি। অবাধ তথ্যপ্রবাহের
প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হই বরাবরই। নিজেদের সঙ্কীর্ণতা
ঢেকে রাখতে ভালোবাসি বলেই যারা সত্য প্রকাশে উদ্যোগী, তাদের নাস্তানাবুদ
করতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব করি না, প্রকাশ্যে বদমাইশ, লম্পট বলে গালি দিতে
ইতস্তত হই না। মারধর জেলজুলুম দিয়ে সায়েস্তা করতে, গুম করতে, খুন করতে
উদ্দত হই বরাবর। আমরা সত্যানুসন্ধানেরত সাংবাদিকদের ভালোবাসতে নাই বা
পারলাম, কিন্তু তাদের জীবন ক্ষতবিক্ষত করার ক্ষেত্রে আমাদের জুড়ি নেই। সব
সরকারের সময় তা হয়েছে হচ্ছে। এ অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। না হলে
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র বলে আর কিছুই যে থাকবে না।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জের ধরে
স্থানীয় এক সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে মধ্যরাতে বাসা থেকে
সন্ত্রাসী কায়দায় তুলে নিয়ে ভয়ঙ্কর নির্যাতন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়,
জেলা প্রশাসক সুলাতানা পারভীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশে সরকারি
কার্যালয়ে ওই সাংবাদিককে আটকে রেখে নির্যাতনের ভিডিও করা হয়। এরপর মাদক
উদ্ধার দেখিয়ে ১ বছরের সাজা ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অনলাইন নিউজ
পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম
রিগ্যানকে ধরে নিয়ে নির্যাতন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে
জেল-জরিমানার ঘটনায় জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের ক্ষমতার অপব্যবহার
নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষমতার অপব্যবহারকারী এ জেলা প্রশাসকসহ সাংবাদিক
রিগ্যানকে নির্যাতন এবং কাল্পনিক ঘটনা সাজিয়ে সাজা দেয়ার সঙ্গে জড়িতদের
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বাংলাদেশ
ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেয়। এ ব্যাপাওে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী
ফরহাদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘কুড়িগ্রামে বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক
আরিফুল ইসলামের ওপর যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই জেলা প্রশাসককে
প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। মধ্যরাতে মোবাইল
কোর্ট ও সাজা কোনকিছুই আইনসম্মত নয়। ডিসি বলেই সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
এদিকে মধ্যরাতে মাদকবিরোধী টাস্কফোর্সের অভিযানে আরিফুল ইসলামকে মোবাইল
কোর্টের মাধ্যমে সাজার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ
বিভাগ। এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় সরকারের
ভাবমূতি দারুণভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে।
পত্রিকান্তে জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন
কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির (কাবিখা) অর্থায়নে একটি পুকুর সংস্কার করে
নিজের নামে নামকরণ করতে চেয়েছিলেন। সাংবাদিক আরিফুল এ বিষয়ে নিউজ করেন।
এরপর ওই পুকুরের নাম জেলা প্রশাসকের নামে করা যায়নি। এ ঘটনার পর থেকেই
সাংবাদিক আরিফুলের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন ডিসি। এছাড়া, সম্প্রতি জেলা
প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়ম ও মুজিববর্ষের টানা নয়-ছয় নিয়ে রিপোর্ট করতে
চেয়েছিলেন সাংবাদিক আরিফ। এ বিষয়ে জানতে পেরে জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে
সাংবাদিক আরিফুলকে বেশ কয়েকবার ডেকে নিয়ে সতর্ক করা হয়। কোনকিছুতে কাজ না
হওয়ায় জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের নির্দেশে শুক্রবার গভীর রাতে আরিফের
বাসায় হামলা করে একটি দল। পুলিশ এবং জেলা প্রশাসকের লোকজন ছিল ওই দলে।
তারা বাসার গেট ও ঘরের দরজা ভেঙে তুলে নিয়ে আসে সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম
রিগ্যানকে। তুলে আনার সময় সাংবাদিক রিগ্যানকে এ বলে শাসায়, তুই অনেক
জ্বালিয়েছিস। পরে তাকে মারধর করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আনা হয়। জেলা
প্রশাসকের কার্যালয়ে চোখ বেঁধে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করা হয়। সে
নির্যাতনের ঘটনার পুরো দৃশ্য ভিডিও করে একজন। এরপর তাকে মদ ও গাঁজা রাখার
অভিযোগে অভিযুক্ত করে ১ বছরের জেল এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে
ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে জেলে পাঠানো হয়। এঘননা সংবাদ পত্র
এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায় বটে!
‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীসহ
অন্যদেও বিরুদ্ধে মামলা সাংবাদিক সমাজের কাছে কখনওই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রকাশিত রিপোর্টে কারও নাম না থাকলেও মানবজমিন সম্পাদক ও রিপোর্টারের
বিরুদ্ধে মামলা বাক-স্বাধীনতা তথা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর
হস্তক্ষেপের শামিল। এছাড়া বেশ কয়েকদিন যাবৎ সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল
নিখোঁজ থাকলেও তার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন বক্তব্য না পাওয়ায়
নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সাংবাদিক সমাজ। এসব ঘটনার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও
সরকারের সঙ্গে সাংবাদিক সমাজের দ্বন্দ্ব তৈরি করার অপচেষ্টা করছে
সংশ্লিষ্ট মহলগুলো। এসব ঘটনার মাধ্যমে বাক-স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সরকারে
প্রতিশ্রুতি বারবার ব্যাহত করার চক্রান্তে ব্যস্ত নানা চিহ্নিত মহল। এ
ধরনের অপচেষ্টাকারীদের বন্ধ করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিধান জরুরী হয়ে
পরেছে। কুড়িগ্রামে মধ্যরাতে সাংবাদিককে তুলে এনে মারধোর ও সাজা দেয়ার
বিষয়টি প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন কওে বৈকি। এ ধরনের কর্মকাণ্ড
মাঠপর্যায়ে সরকার ও প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা কমায় এবং পরিস্থিতি বিরূপ
করে তুলতে পারে। এর সত্য যে হালসময়ে কতক অনলাইন গণমাধ্য এবং সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে কল্পকাহিনী প্রকাল কওে সরকারের ভাবমূতি দারুণভাবে
ক্ষুন্ন করছে। এ কথ্যা সত্য যে বাংলাদেশ উন্নত হচ্ছে। পদ্মা সেতু,
মেট্রোরেল, এপ্রেসওয়েসহ সড়ক যোগাযেগের ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য দেখাচ্ছে।
এদেশের মানুষের সংগতি বাড়ছে। এখন আমাদের আর কেউ তলাবিহীন ঝুড়ি বলতে পারে
না। আমাদের রাষ্ট্রিয়  এবং প্রধানমন্ত্রীর অনেক দু:সাহসী কর্মকান্ডে তাক
লাগিয়ে দিচ্ছে অনেক উন্নত রাষ্ট্রকে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু কিছু অনলাই,
ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজীক যোগাযোগ মাধ্যমে  মিথ্যাসব তথ্য দিয়ে দেশের
ভাবমূতি দারুণভাবে ক্ষন্ন করা হচ্ছে। যার সাথে প্রকৃত দেশ প্রেমী
সাংবাদিকরা মোটেও যুক্ত নন।
যারা সাংবাদিক হয়রানী করছেন তাদের একটি কথা স্বরণ করিয়ে দেয়া জরুরী।
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকদের মাধ্যমেই
উঠে আসছে। বলতে দ্বিধান নেই অধিকাংশ সাংবাদিক এবং ২/১টি ছাড়া সকল
সংবাদপত্র তথা প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক্স গনমাধ্যম সরকারের পজেটিভ
কর্মকান্ড তুলে ধরে সরকারকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যাপক কাজ কওে
যাচ্ছেন। এদেশের সংবাদপত্র এবং সাংবাদিক সমাজ সরকারের প্রতিপক্ষ নয়। তবে
কেন এমন কঠোর আইন করেছে সরকার। অতি উৎসাহী আমলা, রাজনৈতিক যেভাবে এ আইনের
অপব্যবহার করছে তাতে সাংবাদিক সমাজ সরকারের বিপক্ষে বিগড়ে যাওয়ার
সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এখন ভাবিছি, সত্যিই সাংবাদিকদের কন্ঠরোধের জন্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা
আইন-২০১৮’ কিনা। অবশ্য আজকাল যেভাবে ডিজিটাল অপপ্রচারকারীর সংখ্যা বাড়ছে
তা ভাবনারই বিষয়। মূহুর্তেই উৎভটসব অপপ্রচার চলে নানা ডিজিটাল যোগাযোগ
মাধ্যমে। তাতে সরকার বিব্রত। কতক পত্রপত্রিকাও এমন প্রচারে সুখ পায় বটে!
তাতে সরকার এমনি বিশেষ ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে।
মিথ্যা প্রচার-প্রচারনা আমাদেরও উৎকন্ঠায় ফেলে। তাই ডিজিটাল
অপপ্রচারকারীদের কন্ঠরোধের প্রয়োজন আছে বৈকি!। ডিজিটাল অপপ্রচারকারীদের
কন্ঠরোধ করতে গিয়ে যেন সাংবাদিকদের কন্ঠরোধ করা না হয় সেটাই
উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বিষয়। সাংবাদিক সমাজে এমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সরকারকে দুর
করতেই হবে। উৎকন্ঠারও কিন্তু কারন আছে। এর আগে ৫৭ ধারা নিয়ে দেশ জুড়ে
সাংবাদিকরা সোচ্চার হয়ে ছিলেন। তখন বলা হয়েছিলো কোন সাংবাদিক এ ধরায়
হয়রানীর শিকার হবেন না। কিন্তু আমরা কি দেখেছি? এ ধারায় সাংবাদিকগণই
সবচেয়ে বেশি হয়রানীর শিকার হয়েছেন।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে কোনো সময়ই সংবাদপত্রের অবাধ
স্বাধীনতা ছিল না। কখনো সংবাদপত্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সেন্সরশিপ,
প্রণয়ন করা হয়েছে বিভিন্ন কালাকানুন। গণমাধ্যমের কার্যালয়ে পুলিশের
মারমুখী অনুপ্রবেশ, কর্মরত সাংবাদিককে চোর-ডাকাতের মতো আটক করার ঘটনা
ঘটেছে অনেক। এবার নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে।
সাংবাদিকগন এনিয়ে এখন বেশ সোচ্চার। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এবং সংবাদপত্র
মালিক সংগঠনও এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সংশোধন
কিংবা বাতিল না হলে সংবাদিক এবং সংবাদপত্র অনৈতিক চাপের মুখে পড়বেন বৈকি!
প্রশ্ন এসেই যায়, আমাদের গণমাধ্যম কি স্বাধীন? সাফ বলতে গেলে আগে কখনো
ছিল না, এখনো নেই। সাংবাদিকতার ইতিহাস সেই ইংরেজ আমল থেকে আজ পর্যন্ত
সংবাদপত্র কখনোই স্বাধীনতার সূর্য দেখেনি। বরাবরই আমরা সাংবাদিক এবং
সংবাদমাধ্যমে হতাশার চিত্র লক্ষ্য করছি। সব সরকারই গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ
করতে চায়, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারও এর বাইরে নয়। বিএনপি-জামাত সরকার
এমনকি তত্ববধায়ক সরকারও গনমাধ্যমের কন্ঠরোধে বেশ পারঙ্গম ছিলো। বিএনপি
ক্ষমতাকালীন সময় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভেতরে সরকারের পেটোয়াবাহিনী
অনুপ্রবেশ করে সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে। তাদের আমলে সাংবাদিক
নির্যাতন এবং হত্যার বহু ঘটনা ঘটেছে। ১/১১ সময় পত্রিকা অফিসে বিশেষ
বাহিনী প্রবেশ করে আঙ্গুল তুলে কোন সংবাদ পত্রিকায় যাবে; আর কোনটা যাবে
না তা বলে দেয়া হতো। এ সরকারের সময় এমনটা নয়, তবে সংবাদপত্র এবং
সাংবাদিকরা স্বাধীন তা বলা যাবে না। এর আগে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা
প্রণয়ন করেছে সরকার। মন্ত্রিসভায় এর অনুমোদন এবং গেজেট প্রকাশ করেছে।
সংসদের চলতি অধিবেশনে উপস্থাপিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে এখন চলছে
নানা জল্পনা কল্পনা। কেন এমন প্রশ্ন সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবীমহলের?
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিধানগুলোর অপপ্রয়োগের আশঙ্কা প্রবল। উল্লেখ্য,
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন প্রথম করা হয় ২০০৬ সালে। পরে ২০১৩ সালে
শাস্তি বাড়িয়ে আইনটিকে আরও কঠোর করা হয়। এ আইনের ৫৭ ধারায় গত কয়েক বছরে
সাংবাদিক ও সরকারি দলের প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ বহু মানুষ
হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার পাশের নারায়ণগঞ্জের
সাংবাদিকগণ হয়রানী হয়েছেন সব চেয়ে বেশি। এর মধ্যে আমার কাছের মানুষ
চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি মোসালীন বাবলাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে একাধিক
মামলায় হয়রানি করা হয়। এটা স্পষ্ট যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৫৭ ধারার
অপপ্রয়োগের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা।
এখানে ষ্পষ্ট যে, বিতর্কিত ৫৭ ধারার বিষয়গুলো এ আইনেও চারটি ধারায়
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। আইনের ১৪টি ধারার অপরাধ হবে অজামিনযোগ্য। বিচার
হবে ট্রাইব্যুনালে, ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করা হবে।
প্রস্তাবিত আইনের ৩২ ধারার অপপ্রয়োগের ফলে তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী
দুর্নীতি মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত আইনি অধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হবে। ফলে
এই ধরনের অপরাধের আরও বিস্তার ঘটবে। এ ছাড়াও অনুসন্ধানীমূলক সাংবাদিকতা ও
যে কোনো ধরনের গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে।
এটি আইনে পরিণত হলে তা সংবিধানের মূল চেতনা, বিশেষ করে মুক্ত চিন্তা, বাক
স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করবে। ডিজিটাল
বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি কল্যাণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন নিশ্চিতের
যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে প্রস্তাবিত আইনটি তাতে বাধা সৃষ্টি করবে।
গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের ভূমিকা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। গণমাধ্যমসহ সকল
নাগরিকের সমস্ত ধরনের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে সরকারকে সহযোগিতা প্রদান এবং
বাধাহীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারে তার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে
সরকারকে।
নীতিমালার নামে মানুষের বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ যেমন নিন্দনীয়, তেমনি
স্বাধীনতার নামে সম্প্রচারমাধ্যম এবং পত্রপত্রিকাগুলোর দ্বারা এর
অপব্যবহার করে সমাজে টেনশন ও গোলযোগ সৃষ্টিও কাম্য নয়। গণমাধ্যম
নিয়ন্ত্রণ গণতন্ত্রহরণেরই নামান্তর। তা করা মোটেও সুখকর নয়। বিশ্বে কোনো
দেশে কোনো সময় তা সুফল বয়ে আনেনি। সরকারের কোন আইন বা নীতিমালার বিরুদ্ধে
আমি নাই। যে কোনো কিছুর জন্য নীতিমালা থাকা ভালো। সমস্যাটা হলো
অপব্যবহারের। আর আমাদের দেশে এ সমস্যাটা প্রকট। আমরা সময় সুযোগ পেলেই যে
কোনো কিছুর অপব্যবহার করি। কোন নীতিমালা বাকস্বাধীনতার সৌন্দর্য রক্ষায়
প্রণীত হবে, সে নীতিমালা যদি ‘নিয়ন্ত্রণের’ রূপ নিয়ে সেই আকাঙ্খিত
স্বাধীনতাকেই টুঁটি চেপে ধরে, তা ঠেকাবে কে? প্রশ্ন হলো, সংসদে ডিজিটাল
নিরাপত্তা আইন অনুমোদিত নীতিমালাটি যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে প্রণীত হয়েছে
কি? সরকার সংশ্লিষ্টদের ভাষায় নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকগণ
হয়রানি হবেন না এমন বিবৃতি এসেছে। যদি তাই হতো, তাহলে ভালো ছিলো। এখনতো
দেখছি কোথাও কোথাও এর অপব্যবহার হচ্ছে। এটা সরকার এবং সাংবাদিকদের সাথে
সংঘাত তৈরি করতে পারে। অধিকাংশ সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকগণ সরকারের
কর্মকান্ডকে সামনে তুলে ধরে প্রকারন্তে সরকারেরই কাজ করছে।  তাহলে
সাংবাদিকরা এভাবে হয়রানীর শিকার হবেন কেন?
ডিজিটাল নিরাপিত্তা আইন নিয়ে কোন বিতর্কে যেতে চাইনা। তবে এ আইনের
অপপ্রয়োগ গণমাধ্যমের সুন্দর পথচলা রুদ্ধ করবে বৈকি! এ মূহুর্তে সংবাদপত্র
তথা সাংবাদিকটের চটানো কতটা সঠিক হবে তা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। ভুল পথে
হাঁটা সরকারের জন্য বিপজ্জনক হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা
আইনের প্রয়োজন রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, বাড়ছে এর
অপপ্রয়োগও। তাই সাইবার অপরাধ বাড়ছে। সরকার বলছে, এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণের
বা দমনের জন্য এ আইন করা হয়েছে; সংবাদপত্র বা বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের
জন্য নয়। মত প্রকাশে বাধা যেন না থাকে সেটা নিশ্চিত করা জরুরী। সাংবাদিক
প্রতিনিধি, শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের
মতামত নিয়ে আইনটিতে যথাযথ পরিবর্তন আনা হোক। যেসব বিধান অপপ্রয়োগ হওয়ার
আশঙ্কা রয়েছে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ থেকে সরকার সেই সব বিধান
সত্তর অপসারণ করবে এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।

✒

 লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও গবেষক।






Related News

Comments are Closed