Main Menu

বঙ্গবন্ধুর শিল্প ভাবনা এবং আজকের বাংলাদেশ  বঙ্গবন্ধুর শিল্প ভাবনায় বাংলাদেশ এবং বাস্তবতা  বঙ্গবন্ধুর শিল্প ভাবনা

মীর আব্দুল আলীম :বঙ্গবন্ধু দেশকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। জীবনের চেয়েও বেশী ছিলো তাঁর দেশ;
তাঁর বাংলা; বাংলাদেশ। এজন্য সারাজীবন জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য
করেছেন। ফাঁসির দড়িও তাঁকে লক্ষ্য থেকে একচুলও নড়াতে পারেনি কখনো। টানা ৯
মাস সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।
বঙ্গবন্ধু বিজয়ীর বেশে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফিরে আসেন স্বাধীন
বাংলাদেশে। ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জনগণের মাঝে। নিজেকে সঁপে দেন দেশ গড়ার
কাজে। শুরু হয় জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তিলাভের সংগ্রাম। সেটা যেন আরেক
সংগ্রাম। দেশের মানুষের অন্য, বস্ত্র, বাসস্থানের সংগ্রাম।
বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন, অর্থনৈতিক সংগ্রামে সফল না হলে দেশের মানুষের
মুখে কখনই হাঁসি ফোঁটানো যাবে না। বঙ্গবন্ধু তাঁর দূরদর্শিতা দিয়ে কৃষি
প্রধান দেশে কৃষিপণ্যকে সামনে নিয়ে যেতে নানা পরিকল্পনা হাতে নেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে জাতি গঠন ও অর্থনৈতিক বুনিয়াদ শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়
করানোর জন্য কৃষি ও শিল্প বিপ্লবে ঝাপিয়ে পরেন। বিশেষ করে দেশের
অর্থর্নীতিক উন্নয়নে শিল্প নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আলাদা ভাবনা ছিল। সেই ভাবনা
থেকে কৃষি ও শিল্পখ্যাতকে শক্তিশালী করতে শিল্প ও কৃষিতে গবেষণায়
মনেনিবেশ করতে বলেন অর্থনীতিবিদ এবং কৃষিবিদদের। তৎকালনি বুদ্ধিজিবীদের
সাথে নিয়েও তিনি এসব পরিকল্পনায় বসতেন মাঝে মাঝেই।
আমরা জানি যে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও গৌরবমণ্ডিত শিল্প হচ্ছে কৃষি। এর পর
একটি দেশের শিল্প। এ দু’টি খাত দেশকে এগিয়ে নিতে পারে অতি দ্রুত। বলা
যায়, শতাব্দীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী ও বিজ্ঞানমনস্ক।
চির আধুনিক রাজনৈতিক নেতা। তিনি বুঝতে পারতে কি করতে হবে। তিনি বিশ্বাস
করতেন, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ও সমৃদ্ধ একটি সোনার বাংলা গড়তে কৃষি এবং
শিল্প বিপ্লবের বিকল্প নেই। তাঁর ভাবনায় ছিলো, কৃষি একটি জ্ঞাননির্ভর
শিল্প, আর উৎপাদনশীল শিল্প দেশের চালিকার চাকা। গতানুগতিক কৃষিব্যবস্থা
দ্বারা দ্রুত ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতির খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব
নয় এটা তিনি বুঝতেন। তাইতো তিনি কৃষিগবেষকদেও কৃষিবিপ্লব ঘটাতে
কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে বলেন। সে মোতাবেক কাজও শুরু করেন। একদিকে কৃষি
অন্যদিকে শিল্প এই দু’য়ে দেশ হবে সমৃদ্ধাশালী। স্বপ্ন দেখেছেন বঙ্গবন্ধু
সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমাড় করে দিতেই ১৫ আগষ্ট।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ভঙ্গ হয়নি। খুনিরা তাঁর দেহ নিথর করে দিলেও, তাঁর
স্বপ্নগুলো ছিলো একেবারে স্বচল। অধিক শক্তি নিয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়িত
হয়েছে। কৃষিতে, শিল্পকারখানায় সমৃদ্ধশালী হয়েছে দেশ। বঙ্গবন্ধু কণ্যা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে চলেছেন।
ভাবাকি যায়, আমাদেও দেশে এখন টিভি ফ্রিজ, এমনকি গাড়ি পর্যন্ত তৈরি হয়।
কোন শিল্প নেই এদেশে। ঔষধ শিল্পে আমরা বহু এগিয়ে গেছি। বিশে^ও অনেক উন্তত
দেশেও আমাদেও ঔষধ রপ্তানি হচ্ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য
কৃষিতে ব্যাপক আধুনিকীকরণ হয়েছে। সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আত্মমর্যাদাশীল
শিল্পমালিক এবং কৃষিবিদরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে দেশের বর্ধিষ্ণু
জনগোষ্ঠীর খাদ্য,বস্ত্রসহ শিল্পপণ্য জোগানে নিয়োজিত রয়েছেন। শিল্প এবং
কৃষিবিদদের চিন্তাচেতনা, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তিগত ধারণা ও
প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের
বিপুল জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর ক্ষুধা ও
দারিদ্র্যমুক্ত দেশ উপহার দিতে সক্ষম হবে বলে আমি আশাবাদী। বঙ্গবন্ধু
সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সমৃদ্ধশালী একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের একমাত্র কামনা বাংলার মানুষ যেন পেট ভরে
খেতে পায়, পরনে কাপড় পায়, উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।’ সে কারণেই কৃষি এবং
শিল্পে দেশকে এগিয়ে নিতে নানা পরিকল্পনা হাতে নেন। বাংলাদেশের শিল্প
উন্নয়ন দর্শন দ্বারা ঋদ্ধ ছিলেন বঙ্গবন্ধ। আজকের বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর
ভাবনা ও উন্নয়ন দর্শনের ফসল বলা যায়।
সন্দেহাতীতভাবেই বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য ছিল তার দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়ন
ঘটানো। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু একটা সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন,
যে সোনার বাংলার উপমা তিনি পেয়েছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে,
ভালোবেসে বঙ্গবন্ধু সেই সোনার বাংলার স্বপ্নকে তার দেশের জাতীয় সংগীত
নির্বাচন করেছিলেন। আজ শেখ মুজিবের সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজে
দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তারই কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বল্পোন্নত
দেশের কাতার থেকে বাংলাদেশকে যিনি এরই মধ্যে নিয়ে এসেছেন উন্নয়নশীল দেশের
কাতারে।
বঙ্গবন্ধুর দর্শন ছিল শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য
বিমোচনসহ সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। এর মধ্যে তিনি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে
বেছে নিয়েছিলেন শিল্পকে। শিল্পে বিপ্লবের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর এ দর্শন
বাস্তবায়নে সবার আগে প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন, ইতিবাচক চিন্তার
বিকাশ এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রয়োগ। বঙ্গবন্ধুর শিল্প ভাবনাকে পাথেয় করে
ইতিবাচক মানসিকতায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে তাই সবার আগে বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধুর
সেই শিল্প আন্দোলনকে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার হাতিয়ার হিসেবে যথার্থ অর্থে
কাজে লাগানো উচিতি। সেই পথ ধরেই এদেশে শিল্প উন্নয়ন হয়েছে তা অস্বিকার
করারর কোন জো নেই। এ উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত
রাখার আমাদেও সকলে নৈতিক দ্বায়িত্ব হয়ে পরেছে। শিল্প অন্তর্নিহিত
শক্তিরকে কাজে লাগানো সেসঙ্গে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য হয়ে
পরেছে।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক।দেশকে এগিয়ে
নেয়ার অগ্রনায়ক। যার ভাবনা ছিলো কেবল বাংলাদেশ। তিনি শোষণহীন সমাজ গঠনের
জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তিনি বাংলার প্রত্যেক মানুষের জীবনের জন্য
ন্যূনতম প্রয়োজন আহার, কাপড়, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কাজের সুযোগ
সৃষ্টির জন্য নিজেকে বিসর্জন দিয়েছেন। বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি
ছিলেন আপসহীন। বিপন্ন জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি জনগণের অধিকার আদায়ে
সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। ভাবতেন দেশ কিভাবে সমৃদ্ধশালী হবে। তাইতো কৃষি
ক্ষেত্রে মনোযোগী হন। শিল্প বিপ্লব ঘটাতে নানা পরিকল্পনা হাতে নেন। ১৯৭৫
সালের ১৫ আগষ্ট থমকে যায় তাঁর সকল পরিকল্পনা।
আমরা সত্যি অকৃতজ্ঞ জাতি। যিনি আমাদের দেশমাতৃকাকে উপহার দিলেন, এই তাকেই
কত না নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। জাতির জনকের বাসভবনে রক্তের বন্যা বইয়ে
দেয়া হলো সেদিন। শিশু রাসেলের কান্না আর আকুতিও ওদের হূদয় স্পর্শ করলো
না। শুধু তই নয়, হত্যাকারীরা তার কবর তিন মাস পর্যন্ত পাহারা দিয়েছে।
সেখানে কাউকে আসতে দেয়া হয়নি। এমনকি দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের
ছবি এদেশে নিষিদ্ধ ছিল। বঙ্গবন্ধুর কবর দেখতে না দেয়া, তার হত্যার ছবি
প্রকাশের নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ঘৃণ্য হন্তারক ওই সামরিক শাসকরা তাতে ভয়
পেত। তাদের ভয়টা ছিল এখানেই যে, তারা নিশ্চিত জানত জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে
মৃত বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি শক্তিশালী। তারা আরো জানত সে সময় এসব ছবি প্রকাশ
পেলে কোনো কিছুতেই বাঙালিকে দাবিয়ে রাখা যাবে না।
সেই ১৫ আগস্ট। সিঁড়িতে পড়ে আছে বাঙালি জাতির প্রাণপ্রিয় বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের রক্তমাখা নিথর লাশ। সিঁড়ি গড়িয়ে রক্ত চলে এসেছে বাহির
আঙ্গিনায়। মহান সেই নেতার রক্ত সোঁদা মাটিতে মিশে গেছে। তিনি তো শুধু এ
দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, ছিলেন না দলবিশেষের প্রধান।
দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী ঝড়-মেঘ ইতিহাসের পথে আমাদের যাত্রায় তিনি ছিলেন
সঙ্গী ও পথপ্রদর্শক। তাকে ভুলব কেমন করে? তাকে কি ভোলা যায় কখনো? তাই তো
ইতিহাসের এই মহানায়কের উদ্দেশে কবি লিখেছিলেন, “যতদিন রবে পদ্মা,
যমুনা/গৌরী, মেঘনা বহমান/ ততদিন রবে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবুর রহমান”।
অবিসংবাদিত এই নেতার জীবন চলার পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। পাকিস্তানের সামরিক
জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ’৬০-এর দশক থেকেই তিনি
বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ লাখো
মানুষের উপস্থিতিতে ঢাকার তৎকালীন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু
বজ্রদৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম।
এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তারই বজ্র নির্ঘোষ ঘোষণায়
উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত জাতি স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ধারণ করে ১৯৭১ সালের
মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অদম্য সাহস ও
অকুক্ত আত্মত্যাগ, সাংগঠনিক শক্তি নিজের বাঙালীসত্তার গভীর অনুরণন
উপলব্ধি করেছিলেন তিনি। কখনো স্বভাবের প্রেরণায়, কখনো সযত্ন উৎসাহে তার
উন্মোচন ঘটিয়েছিলেন। দেশবাসীকেও তেমনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন সেই সত্তার
জাগরণ ঘটাতে।
দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে এক মোহনীয় স্বপ্ন রচনা করেছিলেন তিনি
ধীরে ধীরে, সেই স্বপ্ন সফল করার আহবান জানিয়েছিলেন সকলের প্রতি। কী বিপুল
সাড়া তিনি পেয়েছিলেন, তার পরিচয় তো আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। ১৯৭১ সালে
যেভাবে তিনি অসহযোগ আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন, তাতে বিম্মিত হয়েছিল সারা
বিশ্ব। ক্ষাত্র শক্তির সঙ্গে নৈতিক শক্তির দ্বন্দ্ব পৃথিবীতে এই প্রথম
সংঘটিত হয়নি। কিন্তুু বাংলাদেশের এই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে যে-ঐক্য
যে-শৃঙ্খলা যে-দুর্জয় সংকল্পের পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল তার তুলনা হয় না।
তারপর সেই ৭ই মাচের্র ভাষণ, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের
সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। যে শুনেছে সে ভাষণ তারই শরীরে বয়ে গেছে
বিদ্যুৎপ্রবাহ। কী ছিল সে ভাষণে? কোনো অজ্ঞাত তথ্য নয়, কোনো অপ্রত্যাশিত
ঘোষণা নয়, ভাষার কোনো কারুকার্য নয়, বলবার কোনো পরিশীলিত ভঙ্গি নয়। তাতে
ছিল এ দেশের সর্বশ্রেণীর মানুষের অকথিত বাণীর প্রকাশ, তাদের চেতনার
নির্যাস, বক্তব্যের অবিসংবাদিত আন্তরিকতা। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে এই
আন্তরিকতার বন্ধন গড়ে উঠেছিল বলেই তো শত্রুদেশে বন্দী থাকা সত্ত্বেও
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর প্রেরণা ছিল সক্রিয়। স্বাধীনতা লাভের জন্য যেমন দৃঢ়
সংকল্পবব্ধ ছিল সকলে তেমনি প্রবল আকাঙক্ষা ছিল তার নেতৃত্বে স্বাধীন ও
সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার। বন্দীদশা থেকে মুক্তিলাভ করে দেশে
প্রত্যাবর্তন করেই তিনি বলেছিলেন যদি দেশবাসী খাবার না পায়, যুবকরা চাকরি
বা কাজ না পায়, তাহলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে; পূর্ণ হবে না। এই ছিল
তাঁর স্বপ্নেরই অংশ। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই তাকে স্বপরিবারে দুনিয়া
থেকে সরিয়ে দেয়া হলো।
দেশপ্রেমিক এই মানুষটি শতবছর আগে ১৭ মার্চ জন্মগ্রহন করেন; তিনি গর্জে
উঠেন ৭ মার্চ; সেই গর্জনেই অর্জন ১৬ ডিসেম্বর। পৃথিবির বুকে নাম লেখালো
স্বাধীন বাংলাদেশ। একজন বঙ্গবন্ধু; একটাই বাংলাদেশ। তাঁর মেধা, প্রঞ্জা,
সততা, সাহস সর্ব্বপরি দেশ প্রেমেই বাংলাদেশের জন্ম হলো। ১৯৭১ সালের ৭
মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) ১৯ মিনিটের এক
জাদুকরি ভাষণে বাঙালি জাতিকে স্বপ্নে বিভোর করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ‘এবারের
সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
‘ভাইয়েরা আমার, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না।’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের ভরাট কণ্ঠের এই আওয়াজে সারা দেশ মুখর হয়। এরপরই সশস্ত্র
মুক্তিযুদ্ধ, ৯ মাসের লড়াই এবং স্বাধীনতা অর্জিত হয়। পওে ভয়াল ১৫ আগষ্ট।
দিন গড়িয়েছে অনেক। আজ বঙ্গবন্ধু নেই। আছে তাঁর স্মৃতি। ‘রক্ত যখন দিয়েছি,
রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশা আল্লাহ।’ বঙ্গবন্ধুর
এই ভাষণ আজও বাংলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে গাঁথা আছে।
বঙ্গবন্ধুকে কি করে ভুলে বাঙ্গালী। বাঙ্গালী শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করছে
তাঁকে। এবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী
পালন করছে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে  ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬
মার্চ পর্যন্ত সময়কে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছে। শতবছর আগে ১৭ মার্চ
প্রিয় এ মানুষটি জন্ম। তিনি ভালোবেসেছিলেন বাঙালি জাতিকে। বীর হতে চাননি
যিনি; ভয় পাননি শহীদ হতে। রক্ত দিয়ে যিনি দেশবাসীর ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ
করতে প্রস্তুত ছিলেন সর্বদা- তাঁকে কী করে স্বরণ না করে বাঙ্গালী?
বঙ্গবন্ধু ক্ষমতাকে ভালোবাসেননি, হৃদয় দিয়ে দেশকে ভালো বেসেছেন, দেশের
মানুষকে ভালোবেসেছেন। অর্থ লোভ তাঁকে ছোঁয়নি কখনো। দেশের ভালোবাসার কাছে
তাঁর কাছে অর্থ ছিলো তুচ্ছ। এমন নেতা কি আর জন্মাবে কখনো এদেশে? যা দেখছি
তাতে বোধ করি কখনই না। বঙ্গবন্ধু হয়ে আর আসবেন না কখনো কেউ। এক
বঙ্গবন্ধ,ু এক বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। বাংলাকে ভালোবাসার এমন মানুষ আর
কখনোই আসবে না এদেশে। তাঁর মতো করে কেউ বাংলাকে আর ভালোবাসবে না;
বাঙ্গালেিক তাঁর মতো করে কেউ আর কেউ আগলে রাখবে না।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিশাল প্রতীক
এবং নিরন্তর প্রেরণার উৎস। এইসব উপাদানের সমন্বয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতার
ইতিহাস এবং এই ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং সর্বোচ্চ স্থানটি যে
বঙ্গবন্ধুর যুক্তিবাদী, বিচারশীল এবং ইতিহাসবোধসম্পন্ন সকল মানুষই এটা
স্বীকার করবেন। এ ব্যাপারে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু তবুও কিছু
লোক বিতর্ক তুলেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর
হত্যা দিবসকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালনের সরকারি সিদ্ধান্তকে ক্ষমতার
জোরে অন্যায়ভাবে বাতিলও করে দিয়েছেন। তাদের এই সিদ্ধান্ত ছিল অদূরদর্শী,
জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বিরোধী এবং ইতিহাসকে অস্বীকার করার নামান্তর।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাপরবর্তী নানা অস্বাভাবিক ঘটনাপ্রবাহের স্রােতে এই
দিনটিকে ১৯৭৫ পরবর্তীকাল থেকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। রাজনৈতিক নানা
স্বার্থ, স্বাধীনতাবিরোধীদের চক্রান্ত এবং কিছু লোকের রাজনৈতিক
উচ্চাভিলাষের কারণে এটি সম্ভব হয়নি। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়
এসে যখন এই দিনকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করল তখন তাকে সকল
গণতান্ত্রিক, ইতিহাসবোধসম্পন্ন ও শুভবুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত দলের
মানুষেরই এটা মেনে নেয়া উচিত ছিল। কারণ বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশ
আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রায় সিকি
শতাব্দী সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন এবং তারই ফলে মানুষের মনে
তার চিন্তা-চেতনা গভীরভাবে প্রভাব ফেলে এবং ধাপে ধাপে সময়োপযোগী
সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ আন্দোলনকে রাজনৈতিক
সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস। বাঙালির ইতিহাসে
শ্রেষ্ঠ সন্তান তিনি। তার জীবন ছিল সংগ্রামমুখর। সংগ্রামের মধ্যেই তিনি
বড় হয়েছিলেন। তার জন্ম তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার
টুঙ্গীপাড়ায়। ছাত্র অবস্থায় তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বায়ান্নর ভাষা
আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের সরকার গঠন, কপ, পিডিপির আন্দোলনে
বঙ্গবন্ধু সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা
সংগ্রামে মহানায়ক হিসেবে ’৭০-এর নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে
এদেশের গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীকে পরিণত করেন। অবিসংবাদিত এই
নেতার জীবন চলার পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার
বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ’৬০-এর দশক থেকেই তিনি বাঙালি
জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ লাখো মানুষের
উপস্থিতিতে ঢাকার তৎকালীন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু বজ কণ্ঠে
ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম,
স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তারই ঘোষণায় উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত জাঁতি স্বাধীনতার
মূলমন্ত্র ধারণ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে
ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অদম্য সাহস ও অকুতোভয় আত্মত্যাগ, সাংগঠনিক শক্তি নিজের
বাঙালি সত্তার গভীর অনুরণন উপলব্ধি করেছিলেন তিনি। দেশবাসীকেও তেমনি
অনুপ্রাণিত করেছিলেন সেই সত্তার জাগরণ ঘটাতে। দেশ ও মানুষের প্রতি
ভালোবাসা থেকে এক মোহনীয় স্বপ্ন রচনা করেছিলেন তিনি ধীরে ধীরে, সেই
স্বপ্ন সফল করার আহ্বান জানিয়েছিলেন সকলের প্রতি। কী বিপুল সাড়া তিনি
পেয়েছিলেন, তার পরিচয় তো আমরা স্বচক্ষে দেখেছি।
১৯৭১ সালে যেভাবে তিনি অসহযোগ আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন, তাতে বিস্মিত
হয়েছিল সারা বিশ্ব। ক্ষাত্রশক্তির সঙ্গে নৈতিক শক্তির দ্বন্দ্ব পৃথিবীতে
এই প্রথম সংঘটিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে
ঐক্য, যে শৃঙ্খলা, যে দুর্জয় সঙ্কল্পের পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল তার তুলনা হয়
না। তারপর সেই ৭ মার্চের ভাষণ, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের
সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। যে শুনেছে সে ভাষণে তারই শরীরে বয়ে গেছে
বিদ্যুৎপ্রবাহ। কী ছিল সে ভাষণে? কোনো অজ্ঞাত তথ্য নয়, কোনো অপ্রত্যাশিত
ঘোষণা নয়, ভাষার কোনো কারুকার্য নয়, বলবার কোনো পরিশীলিত ভঙ্গি নয়। তাতে
ছিল এ দেশের সর্বশ্রেণির মানুষের অকথিত বাণীর প্রকাশ, তাদের চেতনার
নির্যাস, বক্তব্যের অবিসংবাদিত আন্তরিকতা। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে এই
আন্তরিকতার বন্ধন গড়ে উঠেছিল বলেই তো শত্রুদেশে বন্দি থাকা সত্ত্বেও
মুক্তিযুদ্ধে তার প্রেরণা ছিল সক্রিয়। স্বাধীনতা লাভের জন্য যেমন দৃঢ়
সঙ্কল্পবব্ধ ছিল সকলে, তেমনি প্রবল আকাক্সক্ষা ছিল তার নেতৃত্বে স্বাধীন
ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার।
বিজয় এসেছে। বাঙালি জাতি পেয়েছে একটি স্বাধীন দেশ। বিশ্ব মানচিত্রে
বাংলাদেশ নামের একটি দেশ সগর্বে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু এই অর্জনের
নেপথ্যে যে মহান ব্যক্তিটির নিরঙ্কুশ অবদান তাকে ছাড়া কী এটি অর্থবহ হয়,
নাকি হতে পারে? তাই গোটা জাতি অধীর অপেক্ষায় ছিলেন কবে ফিরবেন অবিসংবাদিত
নেতা। কবে পূর্ণতা পাবে বাংলাদেশ নামের দেশটি স্বাধীনতা অর্জন। সব
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলার মাটিতে
পা রাখলেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমান লন্ডন-দিল্লি হয়ে আজন্ম লালিত স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি
স্পর্শ করেন পরম মমতায়। সেদিন স্বজনহারানো সর্বস্বান্ত মানুষ হৃদয় উজাড়
করে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে বরণ করে নিয়েছিল। নেতা ও জনতার আনন্দাশ্রু
মিলেমিশে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয় যা স্মৃতির আকাশ থেকে কখনো
মুছবার নয়।
তবে তিনি খুব সহজেই দেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারেননি। স্বাধীন বাংলাদেশের
স্থপতির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথ ছিল ভয়ঙ্করভাবে কণ্টকাকীর্ণ।
মুক্তিযুদ্ধকালে দীর্ঘ ৯টি মাস বঙ্গবন্ধুকে শুধু যে দুই হাজার মাইল
দূরবর্তী পাকিস্তানের নির্জন একটি কারাগারের ‘ডেথ সেলে’ বন্দি করে রাখা
হয়েছিল তাই নয়, পাশাপাশি তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর সর্বাত্মক প্রস্তুতিও
চলছিল। সামরিক জান্তার গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে চলছিল
প্রহসন। বিশ্বের বহু খ্যাতনামা রাষ্ট্রনায়কসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি তার
নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান। সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর প্রাণ রক্ষায়
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা
গান্ধী। প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসার পর বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে এক
আবেগঘন বক্তায় বলেন যে, তিনি ফাঁসির জন্য প্রস্তুত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু এও
বলেন যে, এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি তার বাংলার মানুষ পেট ভরে
খেতে না পায়, মা-বোনেরা কাপড় না পায়। তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে
এশিয়ার ‘রাইজিং টাইগার’ হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখে মুগ্ধ হতেন তো
বটেই।
বিশে^র বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এশিয়া মহাদেশে যে
স্বল্প সংখ্যক ক্ষণজম্মা ও প্রকৃত অর্থে মানবপ্রেমী রাজনৈতিক
ব্যক্তিত্বের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে সক্রিয় ও সফল ভূমিকা এবং অসামান্য
অবদান লক্ষ্য করা যায়, তাঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল
অন্যতমই ছিলেন না, সম্ভবত তাঁর অবস্থান সবার শীর্ষে। নিদ্বিধায় বলা যায়,
বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে তাঁর মতো এমন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব
বিরল। তাইতো তাঁকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলা হয়। তাঁর জীবন ও
রাজনীতি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও ক্রমবিকাশমান ধারায়
ভৌগলিক সীমারেখায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক
আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বাঙালির হাজার বছরের লালিত
আশা-আকাক্সক্ষা, বেদনা-বিক্ষোভ; সর্বোপরি আবহমান বাংলার বৈশিষ্ট্যকে
তিনি নিজের জীবনে আত্মস্থ করেছেন। তাঁর কণ্ঠে বাঙালি জাতির সার্বিক
মুক্তির আকাক্সক্ষা প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
শুরুতে যুদ্ভবিদ্ধস্ত দেশের রাষ্ট্রীয় খাতকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্পায়নের
ভিত্তি সুদৃঢ় করলেও ধীরে ধীরে তিনি ব্যক্তিখাতের বিকাশের জন্য অনুকূল
পরিবেশ সৃষ্টির দিকে মনোযোগী হন। তাই ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায়
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এ আর মল্লিক উল্লেখ করেন যে, “পুঁজি বিনিয়োগে
বেসরকারি উদ্যোক্তাদিগকে যথাযথ ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করিবার জন্য এবং
বৈদেশিক পুঁজি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিকল্পে, সরকার চলতি
অর্থবৎসরের শুরুতে বেসরকারী পুঁজি বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা ২৫ লক্ষ হইতে ৩
কোটি টাকায় উন্নীত করেন এবং বেসরকারী খাতে কয়েকটি নতুন শিল্প গড়িয়া তোলার
অনুমতি দেওয়া হইয়াছে। (বাজেট বক্তৃতা, ১৯৭৫-৭৬, পৃ: ৫)। তাছাড়া ১৩৩টি
পরিত্যক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান মালিকদের ফিরিয়ে দেয়া হয়, ৮২টি
ব্যক্তিমালিকানায় ও ৫১টি কর্মচারী সমবায়ের নিকট বিক্রি করা হয়। এভাবেই
তাঁর জীবদ্দশাতেই শিল্পায়নকে সামনে এগিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
পরবর্তী সময়ে এই প্রক্রিয়া বেগবান হয়। ধীরে ধীরে ব্যক্তিখাত শিল্পায়নের
মূল চলিকাশক্তিতে আবির্ভূত হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির জনক ও স্বাধীন সার্বভৌম
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। বাঙালি জাতীয়তাকে বঙ্গবন্ধু আমাদের চিন্তা-চেতনা
ও মননে গেঁথে দিয়েছেন। তাই বঙ্গবন্ধুর নামে ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় রচিত
হয়। ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য কোনো কিছুই তাঁর প্রয়োজন হয়নি।
পাকিস্তানি শাসকবর্গের চাপিয়ে দেওয়া দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনা, নিপীড়ন ও অবিচার
থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিরামহীন সংগ্রামে
তিনি তাঁর সমগ্র জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। জেল-জুলুম, ভয়-ভীতি, লোভ-লালসা,
ষড়যন্ত্র কোনো কিছুই তাঁকে তাঁর মানুষদের কাছে থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে
পারেনি। তাই বলা হয়, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্য। মনে রাখতে হবে যে,
বঙ্গবন্ধু পূর্বাপর একজন অনমনীয় ও অনন্য সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। আশৈশব
সংগ্রামী ভূমিকায় তিনি কখনোই কোথাও কোনো আপোষ করেননি। একারণেই তাঁকে
বারংবার কারাবন্দি হতে হয়েছে।
সব বিষর্জন দিয়ে তিনি দেশ স্বাধীন করেছেন। তাঁর গড়া বাংলাদেশেই,বাঙ্গালী
শত্রুই বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। কিন্তু মৃত বঙ্গবন্ধু শতগুণ
আলোকিত হয়ে প্রতিটি বাঙালির মননে গ্রোথিত হয়ে রয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনবোধ
এবং সমাজ ও রাষ্ট্রদর্শন থেকে তাঁর উন্নয়ন চিন্তা চেতনার কিছু উপাদান
খুঁজে পাওয়া যায়। সামষ্টিক বিচারে বঙ্গবন্ধুর সমগ্র রাজনৈতিক কর্মকা-ের
মূল অনুষঙ্গ হলো তাঁর দেশের মানুষ এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে
তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন তন্ন তন্ন
করে খুঁজে বেড়িয়েছেন স্বদেশকে। গরিবহিতৈষী বঙ্গবন্ধু সেজন্যেই স্বাধীন
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম কৃষকদের দিকে নজর দেন; পওে শিল্প বিপ্লবে হাত দেন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৃষক-শ্রমিকসহ মেহনতী
মানুষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। গরীব- দুঃখী
মানুষের মুখে হাঁসি ফোটানোর অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু নির্ভক ছিলেন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এই পরিকল্পনায়
বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয় ভূমি ব্যবস্থাপনা,শিল্পের বিকাশ, ক্ষুদ
উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্রদান, সমবায় ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা ও
মানসম্পন্ন যুগপোযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা ইত্যাদি। মৌলিক চাহিদা মেটাতে
সরকারের ভূমিকা কেমন হবে? বিশ^ মানের দক্ষ মানব সম্পদ বিভাবে গড়ে তোলা
যায় । এ সব কর্ম পরিকল্পনা ছিল বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক ভাবনা। যুদ্ধ বিধস্ত
দেশটিকে কিভাবে অর্থনৈতিক ভাবে পুনর্গঠন করা যায় তা ছিল পঞ্চবার্ষিকী
পরিকল্পনায়। পরিকল্পনায় অতি নিম্ন আয় এবং সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিত মানুষের
জন্য বাস্তব সম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়ন-ই ছিল মূল উদ্দেশ্য। উন্নয়ন
একটি ধীর ও বেদনাদায়ক প্রক্রিয়া। বঙ্গবন্ধু সবাইকে নিয়ে একটি পরিকল্পিত
অর্থনৈতিক উন্নয়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। নতুন নতুন শিল্প গড়ে বিপুল
পরিমাণ বেকার ও অর্ধবেকার জনশক্তিকে উৎপাদনশীল কাজে লাগাবার সুপারিশ করা
হয়। ঋণ বা অনুদান নির্ভরতায় নিরুৎসাহিত করা হয়। কৃষি উপকরন সহজলভ্য করা।
পাশাপাশি বিদুৎ ও গ্যাস খাতের সম্পসারনে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। নতুন নতুন
কর্মসংস্থান, শ্রম বাজার সৃষ্ঠিতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ কারা হয়। কুটির
শিল্পের মধ্যে হস্তচালিত তাঁত শিল্প, চামড়াজাত পণ্য, ধাতব পণ্য ইত্যাদি
খাতে বিশেষ বিবেচনা করা হয়। বঙ্গবন্ধু মনে প্রাণে বিশ^াস করতেন যে,
প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যেমে এ দেশের কৃষি ও শিল্প বিপ্লব সেই
সাথে বাঙ্গালি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব। উৎপাদন বৃদ্ধি,সুষম,বন্টন,
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামের সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমেই কাঙ্খিত সাফল্য
অর্জন সম্ভব। বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন ছিল এ দেশের সাধরণ মানুষের সুখ ও
সমৃদ্ধি নিশ্চত করণ। বঙ্গবন্ধুর  রাজনৈতিক দর্শন ছিল গণমানুষের অর্থনৈতিক
মুক্তি। এ দর্শনে ছিল সোনার বাংলার প্রতিটি মানুষের মুখের হাঁসি ফোটানোর
স্বপ্ন। তিনি চেয়েছিলেন গোটা অর্থনৈতিক- সামাজিক ব্যবস্থার আমুল
পরিবর্তন, চেয়েছিলেন ঔপনিবেশিক নির্ভরতা থেকে মুক্তি। হয়তো সেটা স্বল্প
সময়ে সম্ভব না ও হতে পারে, কিন্তু তা নিরাপদ ভবিষ্যত সৃষ্টি করবে
নিশ্চিতভাবে- এভাবেই চিন্তা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই থেকে আজকের
বাংলাদেশ।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রধানত ব্যক্তিখাত নির্ভর হলেও তাকে
সহায়তার জন্যে জ্বালনীসহ মেগা অবকাঠামো খাত সরকারি বিনিয়োগেই গড়ে উঠেছে।
সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ ঘিরেই দেশে উল্লেখ করার মতো প্রবৃদ্ধির হার
অর্জিত হচ্ছে। সর্বশেষ অর্থবছরে আমরা ৮.১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি।
চলতি অর্থবছরে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ৮.২০ শতাংশ। শুধু প্রবৃদ্ধি নয় এদেশের
বঞ্চিতজনদের জন্য ব্যাপক অংকের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচী গ্রহণ করা
হয়েছে। অতিদারিদ্র্যের হার আগামী কয়েক বছরেই কমিয়ে পাঁচ শতাংশের আশেপাশে
আনার ঘোষণা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সবার জন্য পেনশন কর্মসূচি চালু
করার পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে। সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ
এগিয়ে যাচ্ছে এটাই স্পস্ট।
বঙ্গবন্ধু একজন ধীমান রাজনীতিবিদ ছিলেন। মাত্র তেরশ চৌদ্দ দিনের শাসনে
তিনি রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নে হাত দিয়েছেন, রাষ্ট্রের আমূল সংস্কার
করেছেন। কিন্তু তিনি একসময় বুঝতে পারলেন, স্বাভাবিক পন্থায় একটি
যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতিরাষ্ট্রকে টেনে তোলা যাবে না। এর জন্যে চাই শিল্প ও
কৃষিখাতে বিশেষ বিপ্লব। তাঁর এই বিপ্লবে কৃষকেরা, শ্রমিকেরা মূল নায়ক।
তিনি তাঁর এ বিপ্লবের মাধ্যমে এই জাতিরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও
সাংস্কৃতিক মুক্তির ডাক দেন। কৃষক, শ্রমিক, মজুরসহ সাধারণ মানুষের
অর্থনৈতিক মুক্তির রাজনৈতিক চেতনা লালন ও চর্চা করতেন তিনি। বাবার দেয়া
উন্নয়ন-দর্শন বাস্তবায়নে তাঁর প্রিয় কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা বদ্ধপরিকর।
তিনি তাঁর বাবার স্বপ্ন পূরণে নির্মাণ করেছেন যমুনার ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু,
নিজেদের অর্থায়নে বিশ্বব্যাংককে চোখ রাঙিয়ে নির্মাণ করছেন পদ্মাসেতু।
পাশাপাশি যানজট কমিয়ে আনতে তৈরি করেছেন নান্দনিক উড়াল সেতু। আকাশে
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-এক পাঠিয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে
এগিয়ে যাচ্ছেন দেশের মানুষকে নিয়ে। তাঁর হাতেই আজ এগিয়ে যাচ্ছে মেট্রো
রেলের কাজ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করে তিনি হয়ে উঠেছেন
উন্নয়নে অদম্য। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং কর্ণফুলি টানেলের মতো
অকল্পনীয় স্থাপনা তৈরির মাধ্যমে তিনি বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন-দর্শনকে দৃশ্যমান
করে তুলেছেন পৃথিবীর কাছে। তাঁর দূরদর্শিতায় আজ আমাদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে
সাত দশমিক আট-ছয়। বাবার মতোই প্রজ্ঞা ও দর্শন দিয়ে তিনি আজ পরিণত হয়েছেন
বিশ্বনেতায়। তাঁর কন্যা আজ পিতার সেই দর্শন বাস্তবায়নে যথেষ্ট সফল।
শেষে একটা কথা বলতেই হয়, বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু জাতিকে যে সোনার বাংলার
স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন, তা সফলতা পেতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ এখন তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে মধ্যম আয়ের দেশে
পরিনত হচ্ছে। তাঁর যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা,
সময়োপযোগী পদক্ষেপেই বাংলাদেশ বিশ্বের বিস্ময় হয়ে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে
যাচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশটি এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বন্দিদশা থেকে
মুক্তিলাভ করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেই বলেছিলেন, ‘যদি দেশবাসী খাবার না
পায়, যুবকরা চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে,
স্বাধীনতা পূর্ণ হবে না’। এই ছিল তার স্বপ্নেরই অংশ। সেই স্বপ্ন
বাস্তবায়নের আগেই তাকে সপরিবারে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া হলো। বঙ্গবন্ধুকে
হারিয়ে অসহায় হয়ে পরে স্বপ্ন দেখা মানুষ গুলো। তিনি চলে গেলেন। আর ফির
এলেন না। আফসোস, এমন একটা নেতা এদেশের আর জন্মায়নি একটিও। তাঁর মতো করে
বাংলাকে আর ভালোবাসবেনি কেউ; কেউ দেশের মানুষকে তাঁর মতো করে আগলে
রাখেনি। হে মহান নেতা ভালো থাকো; স্বর্গীয়সুখে থাক। হাজারো সালাম তোমায়।

✒

 লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও গবেষক।






Related News

Comments are Closed