Main Menu

ঈদ এবং মাদক ওরা বানায় : আমরা সেবন করি

মীর আব্দুল আলীম“ঈদে মাদকে ছয়লাব দেশ”। পত্রিকার শিরোনামটা নতুন নয়। প্রতি ঈদেই এমন সংবাদেও
মুখোমুখী হই আমরা। কোন ভাবেই মাদক নিয়ন্ত্রন করতে পারছে না সরকার। আর ঈদ এলে
মাদক কেনাবোঁচা অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে ভারত থেকে ফেসন্সিডিল আর মিয়ানমার
থেকে ইয়াবার বড়বড় চালান আসে বাংলাদেশে। মিয়ানমার ইয়াবা তৈরি করে আর ভারত
ফেন্সিডিল। এসব ইয়াবা আর ফেন্সিডিল সেবন করছে বাংলাদেশের মানুষ। এসব মাদক
বেঁচে প্রতি দিন আমাদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ভারত, মিয়ানমার। আর তাতে
আমাদের যুবসমাজ ইয়াবা আসক্ত হয়ে ধ্বংশে নিপাতিত হচ্ছে। কি করছি আমরা? আমাদের
সরকারও কি করতে পারছে? শত শত মাদক বিক্রেতাকে ইতোমধ্যে ক্রসফায়ার দেয়া হয়েছে।
তাতেও কি মাদক কেনাবেঁচা বন্ধ হয়েছে? না; পুরদমেইল চলছে মাদক ব্যবসা।
সেবনকারীও কমেনি, কমেনি বিক্রেতাও। একজন ক্রসফায়ারে মরলে গডফাদাররা সঙ্গে
সঙ্গে ২/৪ জন চুনপুটি বিক্রেতাওয়ালার জন্মদেয়। তাই মাদক ব্যবসা না কমে বাড়ে
বৈকি! এাদক নিয়ন্ত্রণে দরকার আইনের সঠিক প্রয়োগ। সরকার কিন্তু মাদক নিয়ন্ত্রণ
ঠিকই করতে চায়। মাদকের ব্যাপারে সরকারের সম্মতি নেই মোটেও, তবে সরকার
সংশ্লিষ্ট কর্তাবাবুদের ম্যানেজ হয়ে যাবার কারনেই মাদকের প্রসারতা প্রতিদিন
বাড়ছে। এদের কারনেই মাদক ব্যবসায়ীরা দেশে মাদকে সয়লাব করে দিতে পারছে।
বাংলাদেশে ইয়াবা আর ফেন্সিডিলের বাজার তৈরি হওয়ায় মায়ানমার এবং ভারত সীমান্তে
অসংখ্য ইয়াবা আর ফেন্সিডিলেরর কারখানা গড়ে উঠছে। এসব কারখানায় বাংলাদেশের
যুবসমাজের জন্য মায়ানমার মরণ নেশা ইয়াবা এবং ভারত থেকে ফেন্সিডিল উৎপাদন করে
তা নির্বিঘেœ সর্বরাহ করা হচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই যে, এসব দেশে মাদক তৈরি
হচ্ছে আমাদের জন্যই। সম্প্রতি মিয়ানমার সফরের অভিজ্ঞতা আমাকে বেশ ব্যথিত
করেছে। বাংলাদেশ ঘেঁষা সীমান্তে মায়ানমারে অসংখ্য ইয়াবা কারখানা গড়ে উঠেছে।
সেসব কারখানা কোটি কোটি পিস ইয়াবা তৈরি হচ্ছে। অবাক করা কথা, মিয়ানমারের
মানুষ, সেখানকার যুবসমাজ খুব একটা ইয়াবা আশক্ত নয়। কোন কোন এলাকায়তো ইয়াবা কি
তা সেখানকার অধিবাসীরা জানেনই না। মুলত বাংলাদেশীদের জন্যই সেখানে ইয়াবা
কারখানা গড়ে উঠেছে। যতদুর জানতে পারি, তাতে নাকি এ ব্যাপারে সে দেশের সরকারের
মৌন সম্মতিও আছে। মিয়ানমার সীমান্তে ইয়াবা কারখানার কথা আমরা জানি, আমাদের
সরকারও জানে, কিন্তু ইয়াবা চোরাচালান রোধ হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না?
মাদক তথা ইয়াবা ব্যবসা নিবিঘেœ হচ্ছে তা বলছি না। মাদক কারবারিরা বন্দুক
যুদ্ধে নিহত হচ্ছে, ধরাও পরছে মাঝেসাজে। যেদিন এ লিখাটি লিখছি সেদিনও সারা
দেশে ১ লাখ পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। তবে এসময় কাউকে আটক
করতে পারেনি। ১ লাখ পিস ইয়াবা সে কি সহজ কথা? ১ দেড় লাখ লোক আসক্ত হতে পারবে এ
ইয়াবায়। দামওতো কম নয়। বাজার মুল্যে কম করে ৫ কোটি টাকা। এত টাকার মাদক ধরা
পরলো আর কাউকে গ্রেওফতার করা গেলো না এটা প্রশ্ন সমানে আসে বৈকি! এইতো হচ্ছে
বেশিরভাগ সময়। যারা মাঝেমধ্যে ধরা পরে তারা কেবল চুনপুটি। আবার ওদের
গডফাদারদের বদান্নতায় ওরা সহসাই ছাড়া পেয়ে যায়। দেশের প্রতিটি সিমান্তেই এমন
হচ্ছে। ভারতের সীমেোন্তও অসংখ্য ফেনসিডিলের কারখানা আছে। সেখানেও এই একই
অবস্থা। পাশ্ববর্তী দেশ গুলো আমাদেরও দেশে মাদকের বাজার তৈরি করে নিয়েছে।
এজন্যই হয়তো দেশ মাদকে ছয়লাব হচ্ছে। মাদক ব্যবসার সাথে দেশের অনেক রাঘববোয়াল
জড়িত। তাই ওদের টিকিটিও ছোঁয়না কেউ। তাই যা হবার তাই হচ্ছে দেশে। আমরা দেশবাসী
দুরভাগা বলেই আমাদের যুবসমাজ সহজে মাদক হাতের নাগালে পাচ্ছে। এ সংক্রান্ত
আইনের তেমন শাসন সক্রিয় নয় বলে আমাদের সন্তানরা দিনদিন অধ:পতনে নিপাতিত হচ্ছে।
দেশ থেকে কেন মাদক নিয়ন্ত্রণ হয় না? যারা মাদক নিয়ন্ত্রণ করবেন কি করছেন তারা?
মাদক পাচার, ব্যবসা ও ব্যবহারকারীর ক্রমপ্রসার রোধকল্পে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক
পর্যায়ে নানারকম কার্যক্রম দেখা গেলেও তেমন কোনো ইতিবাচক ফল মিলছে না। মাদক
শুধু একজন ব্যক্তি কিংবা একটি পরিবারের জন্যই অভিশাপ বয়ে আনে না, দেশ-জাতির
জন্যও ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনছে। নানারকম প্রাণঘাতী রোগব্যাধি বিস্তারের
পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ করে তুলছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীর সহযোগিতায় দেশের অভ্যন্তরে মাদকের বিকিকিনি এবং বিভিন্ন সীমান্তপথে
দেশের অভ্যন্তরে মাদকের অনুপ্রবেশ নিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার
অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এবার প্রত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মাদক
ব্যবসার অত্যন্ত নিরাপদ স্থানগুলোর একটি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। কারারক্ষীদের
সতর্ক পাহারা থাকতেও যদি কারাগারে মাদক ঢুকতে পারে তাহলে সারাদেশের অবস্থা যে
কী তা সহজেই অনুমান করা যায়। দেশের প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় মাদকদ্রব্য
বিকিকিনির বিষয়টি এ দেশে বলতে গেলে ওপেন সিক্রেট। বিভিন্ন সময়ে পুলিশি অভিযানে
মাদকদ্রব্য আটক ও এর সঙ্গে জড়িতদের আটকের কথা শোনা গেলেও মাদক ব্যবসার নেপথ্যে
থাকা ‘গডফাদার’দের আটক করা হয়েছে কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা
হয়েছে এমন কথা শোনা যায় না। ফলে মাদকবিরোধী নানা অভিযানের কিছুদিন যেতে না
যেতেই আবারো নতুন করে মাদক ব্যবসার প্রসার ঘটে। মাদক ব্যবসায়ীদের প্রধান
টার্গেট হচ্ছে তরুণ সমাজ। দেশের তরুণ সমাজ মাদকের ভয়াবহ প্রভাবে বিপথগামী
হচ্ছে। মাদকের নীল ছোবলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্ম। যা একটি
দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ দুঃসংবাদ বই নয়। সত্য যে, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার
প্রকট রূপের পেছনে মাদক অন্যতম বড় একটি উপসর্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। এর মতো
উদ্বেগজনক ঘটনা আর কী হতে পারে?
দেশে মাদক যেন মুড়ি-মুড়কির মতো বিকিকিনি হচ্ছে। পত্রিকার সূত্র মতে, দেশে বছরে
২৫ হাজার কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা হয়। মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা কত তার সঠিক
পরিসংখ্যান কারও কাছে নেই। সরকার বলছে, ৫০ লাখ, কিন্তু বেসরকারি সূত্র মতে, ৭০
লাখেরও বেশি। এদের অধিকাংশই যুবক-যুবতী ও তরুণ-তরুণী। মাদক গ্রহণকারীর ৮০
ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছর। বিশ্বের নেশাগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান
৭ম। এর ভয়াল থাবা বিস্তৃত হয়েছে শহর হতে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। বিভিন্ন
মাদকের মরণ নেশায় প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে ৮-১০ বছরের শিশু হতে শুরু করে নারী
এমনকি বৃদ্ধরাও। ২০০২ সালে দেশে মাদক অপরাধীর সংখ্যা ছিল ৬ শতাংশ। বর্তমানে তা
৪০ শতাংশের বেশি। এর ব্যবসা জমে ওঠেছে দেশে। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওস নিয়ে
গঠিত ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’, ভারত, নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে
‘গোল্ডেন ওয়েজ’ এবং পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে
‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ বাংলাদেশকে ঘিরে ফেলেছে। ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম
মাদক উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের থাবার মধ্যে অবস্থান করছে। বাংলাদেশকে ঘিরে
প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার ফেনসিডিলের কারখানা। সংঘবদ্ধ
চক্র মিয়ানমার হতে কক্সবাজার দিয়ে সারাদেশে সুকৌশলে ছড়িয়ে দিচ্ছে ইয়াবা। নতুন
নেশা ইয়াবার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ। বিশেষ করে স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়গামী
ছেলেমেয়েরা। ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবার কোনটি দেশে উৎপাদিত না হলেও তা পাওয়া
যাচ্ছে যত্রতত্র। সামাজিক সমস্যা ছাপিয়ে এটি যেন গত দু’দশকে পারিবারিক সমস্যায়
পরিণত হয়েছে। প্রায়ই চোখে পড়ে মাদকের করাল গ্রাস থেকে ফেরাতে না পেরে পরিবারের
শান্তি রক্ষায় বাবা-মা তার সন্তানকে, সন্তান বাবাকে পুলিশে সোপর্দ করছেন।
মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে পিতা-মাতা খুন-জখমের ঘটনা অহরহ ঘটতে শুরু করেছে।
সন্তানের নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত বাবা-মা ও সমাজের দৃষ্টি রাখা দরকার।
আমরা মনে করি মাদক সংশ্লিষ্ট চুনোপুঁটি থেকে রাঘব-বোয়াল পর্যন্ত প্রত্যেকের
ব্যাপারেই আইন প্রয়োগে কঠোরতা দেখাতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগই মাদকের ভয়াবহ
বিস্তার রোধে সহায়ক হতে পারে। মাদক আমাদের সমাজকে কীভাবে কুরে কুরে খাচ্ছে তা
নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এ সমস্যা সমাজ ও রাষ্ট্রের। দেশের উদীয়মান
শ্রেণী যদি সমাজ বৈশিষ্ট্যের বিরূপতার শিকার হয় তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
দেশকে রক্ষা করতে হলে সংশ্লিষ্টদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিস্থিতি
উত্তরণে মাদকাসক্তি, যৌনাচার এবং পর্নোগ্রাফি প্রতিরোধে সুচিন্তিত ও সমন্বিত
কর্মপন্থা গ্রহণ করা দরকার। একটি প্রজন্ম ধ্বংস হওয়ার আগে আমাদের সবার দায়িত্ব
হবে দেশ থেকে মাদক নির্মূল করা। এজন্য দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী,
মন্ত্রী, এমপি সবাই যে যার জায়গা থেকে মাদকের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে।
হুঙ্কার দিতে হবে দেশ থেকে মাদক নির্মূল করার। আমরা বিশ্বাস করি রাষ্ট্রের
কাছে মাদক সিন্ডিকেট মোটেও শক্তিশালী নয়। রাষ্ট্র চাইলে দেশের মাদক প্রসারতা
কমবে। আর রাষ্ট্র তা সহসাই করবে এ প্রত্যাশা রইল।
লেখক- মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিষ্ট।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.