Main Menu

হাজার বছরের পুরানো (একটি আদি মধ্যযুগের বৌদ্ধ মন্দির) সৌন্দর্যে ভরপুর


শামীম আখতার, ব্যুরো প্রধান খুলনা: যশোরের কেশবপুর উপজেলার ভরত-ভায়না গ্রামে হাজার বছরের পুরানো নয়নাভিরাম ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ভরত-রাজার দেউল। বুড়িভদ্রা নদীর প্রায় ৩০০ মিটার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে গ্রাম বাংলার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির মাঝে ১ দশমিক ৭৬ একর জমির উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেউলটি। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর। দর্শনার্থীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য ২০১৬-২০১৭ এবং ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কাজে ১ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
১৯২৩ সালে স্থাপনাটিকে (দেউল) আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া কর্তৃক সংরক্ষিত প্রতœস্থান ঘোষণা করা হয়। প্রতœতাত্ত্বিক খননে উন্মোচিত ক্রুশাকৃতির স্থাপনাটি আদি মধ্যযুগের (আনু.৭ম-৯ম শতক)। ভরত ভায়নার সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পর্যটন সুবিধা তৈরীর লক্ষ্যে একটি প্রস্তাবনা প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে প্রেরণ করেছে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়, খুলনা ।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ভরত-ভায়না দেউল সংলগ্ন এলাকায় সীমানা নির্ধারণ করে প্রাচীর দেওয়া হয়েছে। আগত দর্শনার্থীদের জন্য একটি উন্নত মানের টয়লেট নির্মাণ এবং মাটি ভরাটের কাজও চলছে। এলাকাবাসী দেউল সংলগ্ন রাস্তার পাশে নানা ধরনের দোকান নির্মাণ করছে। দেউল নিরাপত্তার দায়িত্বে ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কাজে নিয়োজিত কর্মীরা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বও পালন করছে। দেউল পরিদর্শন কালে ঐ গ্রামের মোহাম্মদ আলী সরদারের (৫৫) সাথে কথা হলে তিনি ভরত-রাজার দেউল সম্পর্কে জানান, বাপ-দাদার কাছে গল্পে শুনেছি এটা অনেক দিনের পুরানো মন্দির। তাঁর নিকট দেউলের মাঝখানে একটা কুয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ওই কুয়ায় নারিকেল বা অন্যকিছু ফেললে সেটি ভদ্রা নদীতে ভেঁসে উঠতো। একই গ্রামের কৃষিজীবী সিদ্দিক সানা (৬০) ও ত্রিমোহিনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিফাতুল ইসলাম (৩৫) একই কথা জানান।
প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে আরও জানা গেছে যে, বর্তমানে ভরত ভায়না বৌদ্ধ মন্দির ও এর আশেপাশে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের ৫ দশমিক ৪১ একর জমি মালিকানা রয়েছে । যার মধ্যে ১,৭৬ একর ভূমি খাস খতিয়ান থেকে এ দপ্তরের অনুকূলে এসেছে, আর ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৬৫ একর ভূমি সরকারীভাবে মূল্য (মোট ২ কোটি ৭২ লক্ষ ২৩ হাজার টাকা) পরিশোধের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। চলতি বছর এখানে পরীক্ষামূলক খনন কাজ শুরু হবে। প্রতি দিন এখানে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন দর্শনার্থীর আগমন ঘটে।
আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ই-িয়া ভরত ভায়না দেউলের খনন কাজ প্রথম শুরু করে এবং প্রতœস্থানটি সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়। একই বছর প্রখ্যাত প্রতœতাত্ত্বিক কে. এন. দীক্ষিত ভরত ভায়না ঢিবি পরিদর্শন করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী প্রায় এটি প্রায় ২৫০/২৭৫ মিটার বেড় ও ১০/১২ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট একটি বিরাট স্তূপ ছিল। তিনি সেখানে ৪৬ সেন্টিমিটার ৩৪.০৭ সেন্টিমিটার মাপের কিছু কিছু ইট দেখে অনুমান করেন যে, এখানকার ইমারতটি গুপ্ত যুগের ছিল এবং এটি ছিল একটি বৌদ্ধ সংঘারাম।
প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক প্রথম ১৯৮৫ সালের এখানে খনন কাজ শুরু হয়। এক দশক পরে ১৯৯৫-৯৬ সালে এখানে পুনরায় খনন শুরু হয় এবং ২০০০-২০০১ সালে শেষ হয়। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের সংস্কারের জন্য আবারও উৎখনন এবং সংস্কার কাজ পরিচালিত হয়। এ সম্পর্কে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়, খুলনার সহকারী পরিচালক ্ও সংস্কারের জন্য উৎখনন কার্যক্রম টিমের পরিচালক জনাব এ কে এম সাইফুর রহমান বলেন যে, ভরত ভায়না স্থাপত্য কাঠামোর শীর্ষদেশে রয়েছে একটি উঁচু বর্গাকার ( প্রতিটি পার্শ্ব ১১.২ মিটার) ভিত্তিবেদী (ঢ়ষধঃভড়ৎস)। এটি চারটি আবদ্ধ প্রকোষ্ঠের সমন্বয়ে গঠিত (প্রত্যেকটি কক্ষের পরিমাপ ২.০২ মি. ঢ ২.১০ মি.) এবং দেয়ালের পুরুত্ব ২.৮০ মিটার। সম্ভবত এর উপরে একটি উপরিকাঠামো (ংঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব) ছিল। বর্তমানে দেয়ালগুলো এবং কয়েক স্তর ইট ছাড়া কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না, অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। স্থাপত্য কাঠামোটিতে সর্বমোট ৯৪ টি আবদ্ধ প্রকোষ্ঠ রয়েছে (মহাস্থানগড়ের নিকটবর্তী গোকুলমেধ, দিনাজপুরের সন্দলপুরের মন্দির ও উত্তর প্রদেশের অহিচ্ছত্রে এধরনের স্থাপত্য কাঠামো দেখা যায়) যার উপরে স্থাপত্য কাঠামোটি নির্মিত। কতগুলো সমান্তরাল দেয়াল দিয়ে নির্মিত এবং মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পলি মাটি দিয়ে ভরাট করা। নির্মাণশৈলি এবং স্তূপ ও মন্দিরের বিবর্তনের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, উন্মোচিত স্থাপত্য কাঠামোটিকে বৌদ্ধ মন্দির বা স্তূপ হিসেবে শনাক্ত করা যায়। এটি ক্রুশাকৃতি শৈলির মন্দির বলে অনুমিত হয়। এই ক্রুশাকৃতি মন্দির সপ্তম শতক এবং সপ্তম শতকের পরবর্তী সময়ের পূর্ব ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। পূর্ব ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের মানদ- অনুযায়ী এই ধরনের মন্দির সর্বোতভদ্র শৈলির মন্দির বলে পরিচিত । খননে প্রাপ্ত তথ্য থেকে এটি খ্রিষ্টিয় ৭ম-৯ম শতকের বা আদি মধ্যযুগের কোন বৌদ্ধ স্থাপনা হতে পারে বলে অনুমান করা যায়।
ভরত ভায়না প্রতœস্থলটিতে নিরাপত্তা ্ও পরিচর্যার জন্য স্থায়ীভাবে ১ জন সাইট পরিচারক, ১ জন দৈনিক শ্রমিক এবং ৬ জন আনসার দায়িত্ব পালন করছে। খনন ও সংস্কার কাজ চলমান থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী দপ্তরের বিভিন্ন গ্রেডের কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করে থাকে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী খনন ও সংস্কারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হয়।
ভরত ভায়না দেউলে ২৯ বছরের চাকরীর অভিজ্ঞতার আলোকে ওই দেউলের সাইট পরিচারক মো. শফিয়ার রহমান শেখ বলেন, ভরত-রাজার দেউল বর্তমানে নয়নাভিরাম ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হওয়ায় প্রতিদিনিই এখানে ৩০০ থেকে ৩৫০ দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে দর্শনাথীদের সংখ্যা আর বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
ভরত ভায়না দেউলের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসারের পিসি শ্রী শিশির রায় জানান, আমি এখানে দায়িত্ব পালনের পর ইভটিজারদের উৎপাত কমেছে। মাঝে মধ্যে ইভটিজার ও বখাটেদের উপস্থিতি টের পেয়ে কৌশলে আমি তাদেরকে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করেছি। বর্তমানে ইভটিজার ও বখাটেদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে।
এ ব্যাপারে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজ খান মিতা বলেন, ভরত ভায়না দক্ষিণবঙ্গের প্রাচীন নিদর্শনের উপস্থিতিকে প্রমাণ করে। খ্রিষ্টিয় ৭ম-৯ম শতকের আদি মধ্যযুগের এ বৌদ্ধ মন্দিরটিকে পরিকল্পিত কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্ব বজায় রেখে পর্যটকবান্ধব স্থান হিসেবে গড়ে তোলা হবে।






Related News

Comments are Closed