কারাগারের আদালতে যা হলো নাইকো দুর্নীতি মামলায়

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নাইকো দুর্নীতি মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি আগামী ১৪ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (৮ নভেম্বর) পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত-৯ এ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের আংশিক অভিযোগ গঠন শুনানি শেষে এ আদেশ দেন বিচারক মাহমুদুল কবির। এদিকে মওদুদ আহমদ নিজেই তার অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি করেন।

এদিন এ মামলার অন্যতম আসামি খালেদা জিয়াকে সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে হাসপাতাল থেকে কারাগারের বিশেষ আদালতে আনা হয়।

১১টা ৫০ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসেন। প্রায় একঘণ্টা ৩০ মিনিট আদালতের কার্যক্রম চলে।

মামলার শুরুতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশারফ হোসেন বিচারককে বলেন, ‘এ মামলায় এগার জন আসামি। এর মধ্যো নয় জনের অভিযোগ গঠন শুনানি শেষ হয়েছে। বাকি আছেন মওদুদ আহমদ ও খালেদা জিয়া। যেহেতু খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করা হয়েছে এবং মওদুদ আহমদও আদালতে আছেন। সেহেতু আজকে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শুনানি শেষ করা হোক।’

খালেদা জিয়ার পক্ষে অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন,‘গতকাল (বুধবার) প্রায় পনেরশ’ বিএনপি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে আদালতে আনা হয়েছে।রিমান্ডের শুনানি নিয়ে আমরা ব্যস্ত ছিলাম। আজ  এখানে আদালত হবে গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় আমরা শুনেছি। আমার চেম্বারের দরজায় একটা নোটিশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়া, উনাকে (খালেদা জিয়া) অসুস্থ অবস্থায় আদালতে নিয়ে আসা হয়েছে। আমাদের পার্টটা (খালেদার) আমরা পরে করবো। এ বিষয়ে আমাদের সময় দেওয়া হোক।’

এরপর এ মামলার আসামি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ নিজেই তার অভিযোগ গঠন শুনানির শুরুতে বলেন, ‘এ মামলায় আজকে অভিযোগ গঠন ও আদেশ দাখিলের জন্য আছে। আমার পার্টটা আমি বলি। এ মামলায় আমি হাইকোর্টে রিভিশনে গিয়েছি। হাইকোর্টের আদেশ পেইন্ডিং আছে। হাইকোর্টে মামলার এত জট আপনি গেলে বুঝবেন। আমি বুঝাতে পারবো না। আপনি আমাকে সময় দেন। আমি হাইকোর্টের আদেশ দেবো।আমি আপিলও করবো না।’

পরে অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘ফৌজদারি  আইনের ৯৪ ধারার অধীনে হাইকোর্টে গিয়েছেন। অভিযোগ গঠন শুনানি করতে বাধা নেই। তিনি (মওদুদ) নিজেই শুনানি করতে চান না। আপনি (আদালত) ওনাকে অনেকবার সময় দিয়েছেন। উনি নিজেই  শুনানি করতে চান না। তিনি হাইকোর্টের কোনও আদেশ আনতে পারবেন না। উনিতো ওনার সম্পদের আগের এক  মামলায় হাইকোর্টে গেছেন। তখনও কোনও আদেশ আনতে পারেন নাই। আমি আশা করি, আপনি (আদালত) অভিযোগ গঠন শুনানি শেষ করবেন।’

বিচারক তখন মওদুদ আহমদকে জিজ্ঞাসা  করেন, ‘আপনার কি কিছু বলার আছে?’ মওদুদ বলেন, ‘জি স্যার। মাননীয় আদালত আমি এখানে (কারাগারে বিশেষ আদালতে) প্রথম আসছি। এটা কী? এখানে ল ইয়ারদের বসার জায়গা নাই। ওয়াসরুম নাই।’

বিচারক তখন মওদুদকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের উত্তরে কিছু বলার আছে?’

মওদুদ বলেন, ‘জি স্যার, আছে। স্যার (আদালত), আমার কাছে প্রয়োজনীয় কোনও কাগজপত্র নেই। কীভাবে শুনানি করবো। আপনি কোনও ডকুমেন্টস দেন নাই। আমি চাই, একবার সময় দেওয়া হোক।’

বিচারক বলেন,‘আপনি (মওদুদ) গত দুমাস আগে হাইকোর্টে গেছেন। আপনি শুধু একটা টেন্ডার নম্বর দিয়েছেন। আজকে আপনি যে দরখাস্ত দিয়েছেন, সেটা নামঞ্জুর করা হলো।’

এরপর মওদুদ আহমদ তার অভিযোগ গঠন শুনানি শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি বিচারককে উদ্দেশ বলেন, ‘স্যার, আমি সুপ্রিম কোর্টের মামলা ছেড়ে এসেছি। একটা সময় দেওয়া হোক। বিচারক বলেন, ‘না, আপনি যেতে পারবেন না। আপনি যত তাড়াতাড়ি শেষ করবেন, তত তাড়াতাড়ি বেগম জিয়া যেতে পারবেন।’

এপর্যায়ে মওদুদ বলেন, ‘ওনাকে এত তাড়াতাড়ি কেন হাসপাতাল থেকে আনা হয়েছে। এটা ঠিক হয়নি।’

এরপর মওদুদ আবারও অভিযোগ শুনানি শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘আমি  যদি সব ডকুমেন্টস দেখাতে পারতাম, তাহলে আপনি আমাকে মামলা থেকে অব্যাহতি  দিতেন।’

বিচারক বলেন, ‘আপনি ২৪১(ক) ধারায় কী বলা হয়েছে, সেটা বলেন। ‘গ্রাউন্ডলেস’  বলার প্রয়োজন নেই।’ মওদুদ বলেন,‘কেন এজাহারে কোনও তথ্য দেওয়া যাবে না? এটা আইনে কোনও বাধা নেই।’

মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আপনি (বিচারক) দেখবেন, তারপর আপনি সব কিছু বিবেচনা করবেন, অব্যাহতি দেবেন কী দেবেন না। আপনি যদি মনে করেন, অব্যাহতি দেবেন, না-হলে অভিযোগ গঠন করবেন। আমি তো আপনার সামনে আসামি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছি।’

মওদুদ আরও বলেন, ‘আমার কাছে কোনও ডকুমেন্ট নাই। আপনি তো কোনও ডকুমেন্ট দেন নাই। সেজন্য আমি  হাইকোর্টে গেছি।’

অভিযোগ পড়ার মাঝখানে বিচারক মওদুদকে বলেন, ‘আপনি গত একটি তারিখে এজাহারের ওপর শুনানি করেছেন। অভিযোগপত্র থেকে শুনানি শুরু করেন।’

মওদুদ বলেন,‘স্যরি স্যার, তাহলে ওইখান থেকে পড়ে শুনাচ্ছি। মওদুদের অভিযোগপত্র পড়ার মাঝখানে বেলা ১২টা ৪৫ মিনিট থেকে ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিচারককে উদ্দেশ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এখানে এ মামলায় আরেকজনকে আদালতে আসতে হবে। আমাকে আদালতে আসতে হলে ওনাকেও (শেখ হাসিনাকে) আদালতে আসতে হবে। একজনকে সেভ করবেন, আরেকজনকে বলি দেবেন,  এটাতো হয় না। আমিতো শুধু তাদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছি। যদি না করতাম তাহলে বলা হতো— কেন আমি দেই নাই।’ এরপর খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি আর বসতে পারছি না।’

খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাবে বিচারক বলেন,‘ওনাকে (শেখ হাসিনাকে) এ মামলায় আনার সুযোগ নাই। উনিতো এ মামলার পার্ট না।’ পরে মওদুদ বলেন, ‘বেগম জিয়া এ মামলায় যা বলতে চেয়েছেন, আমি তা বলছি। উনি (খালেদা) বলতে চেয়েছেন, নাইকো নিয়ে আরেকটি মামলা হয়েছিল, মামাল নম্বর- ১৯। একই ঘটনার ওপর বেগম জিয়ার নামেও মামলা হয়েছে, যার মামাল নম্বর- ২০।’

এরপর ১২টা ৫৫ মিনিটে আদালতের কাছে শুনানি শেষ করতে বলেন মওদুদ আহমদ। এসময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বিরোধিতা করে বলেন, ‘আদালতের সময় ৯টা থেকে ৫টা। এখনও পর্যাপ্ত সময় আছে। আপনি শেষ করেন।’ তখন মওদুদ বলেন, ‘আপনি জোর করছেন কেন? আপনি জোর করতে পারেন না। আমার ৮১ বছর বয়স। স্যার (আদালত) আমাকে সময় দেন। আমি চেষ্টা করবো আগামী তারিখে শেষ করতে।’

খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী বোরহান উদ্দিন আদালতকে বলেন,‘স্যার, ওনার  (মওদুদের) শরীর কাভার করছে না। তিনি অসুস্থ আজকের মতো সময় দেওয়া হোক।’ পরে মওদুদকে উদ্দেশ করে বিচারক বলেন, ‘আচ্ছা, আগামী তারিখে আপনি শেষ করবেন।’

আবারও মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন,‘স্যার, আমাদের আপত্তি আছে।’ মওদুদ বলেন,‘কেন এত জোর করছেন?’

এরপর খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বিচারককে বলেন, ‘স্যার, আপনি এজলাস থেকে নেমে যাওয়ার পর বেগম জিয়ার সঙ্গে ওনার মামলার বিষয়ে আমরা আধাঘণ্টা কথা বলবো। আমরা একটা দরখাস্ত দিচ্ছি।’ তখন বিচারক বলেন,‘এটা আমার কিছু করার নাই। এটা আমি দিতে পারবো না।’

এরপর বিচারক ১৪ নভেম্বর পরবর্তী তারিখে মওদুদ আহমদকে অভিযোগ গঠন শুনানি শেষ করতে নির্দেশ দেন। তারপর খালেদা জিয়ার পক্ষে অভিযোগ গঠন শুনানি শুরু হবে বলেও বিচারক জানান।

এদিকে, বৃহস্পতিবার সকালে খালেদা জিয়াকে গাড়ি থেকে হুইল চেয়ারে করে আদালতের ভেতরে আনা হয়। তার পরনে ছিল গোলাপি রঙের থ্রি পিস ও  সাদা ওড়না। পায়ে স্পন্সের সাদা জুতা। একঘণ্টা ৩০ মিনিট ধরে আদালতের কার্যক্রম চলে। এই পুরো সময়জুড়ে খালেদার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার কাজের মেয়ে ফাতেমা।আদালতের কার্যক্রম শেষে হুইল চেয়ারে করে খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।






Related News

Comments are Closed