Main Menu

ছি লজ্জা! কি লজ্জা! এ লজ্জা গোটা রাষ্ট্রের জাগ্রত হোক দেশের বিবেক

alim-pp-15একজন নারী যখন ধর্ষিত হয় কিংবা খুন হয় তখন তার সুরতহাল রিপোর্ট সম্পন্ন করছেন একজন পুরুষ ডাক্তার। কখনো সঙ্গে থাকেন পুরুষ পুলিশ অফিসারও। এটি খুবই লজ্জাজনক একটা ব্যাপার। এ লজ্জা গোটা রাষ্ট্রের, সমাজের। একজন মৃত নারী কিংবা ধর্ষিতা কেন শ্লীলতাহানির শিকার হচ্ছেন? নারীর সবচেয়ে বড় যে জায়গায়টা তা হলো সম্মানবোধ। আমরা এখনো নারীদের কেন সম্মান দিতে পারছি না? রাষ্ট্রের একজন নারী যখন ধর্ষিত হয় কিংবা খুন হয় তখন তার সুরতহাল রিপোর্ট সম্পন্ন করছেন একজন পুরুষ ডাক্তার। আর কখনো সঙ্গে থাকেন পুরুষ পুলিশ অফিসারও। এটা কতটা লজ্জার? এসংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায়ও অকার্যকর। এখনও হরহামেশাই নারীর মৃতদেহ কিংবা ধর্ষিতার দেহ পরীক্ষা করছে পুরুষ। এটা একজন নারীর জন্য কতটা অপমানের? রাষ্ট্রের কি অধিকার আছে একজন নারীর শ্লীলতাহানি করার? এটা তো অবশ্যই শ্লীলতাহানি। আমরা জানি একজন ধর্ষিতাকে কী পন্থায় ডাক্তারি পরীক্ষা (সুরতহাল) করা হয়। নির্যাতনের শিকার একজন নারীর জন্য এটি দ্বিতীয়বার যৌন নির্যাতনের শামিল। নির্যাতনে শিকার নারী এর ফলে মানুষিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এ ধরনের পরীক্ষা আবশ্যিকভাবে নারী ডাক্তার ও নার্স দিয়ে করা উচিত। এ রাষ্ট্র কি সে ব্যবস্থা রেখেছে? রাষ্ট্রের কি অধিকার আছে একজন নারীর শ্লীলতাহানি করার? আমি বলবো এটা তো অবশ্যই রাষ্ট্রিয় শ্লীলতাহানি। আমরা জানি, একজন ধর্ষিতাকে কী পন্থায় ডাক্তারি পরীক্ষা (সুরতহাল) করা হয়। নির্যাতনের শিকার একজন নারীর জন্য এটি দ্বিতীয়বার যৌন নির্যাতনের শামিল। নির্যাতনের শিকার নারী এর ফলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এ ধরনের পরীক্ষা নারী ডাক্তার ও নার্স দিয়ে করা উচিত। এ রাষ্ট্র কি সে ব্যবস্থা রেখেছে?
কুমিল্লার কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর হত্যায় ব্যথিত হননি দেশে এমন মানুষ খুব কমই আছেন। আলোচিত একটি ঘটনা। পুরদস্তর সোহাগী একজন যুবতী। আলোচিত এই নারীর সুরতহাল কে করেন? কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পুলিশ ফাঁড়ির এসআই সাইফুল ইসলাম। ‘ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে অজ্ঞাত নারীর লাশ উদ্ধার’ অতিনিকটের একটি পত্রিকার শিরোণামের সংবাদে ঐ নারীর গোপণ অঙ্গে আঘাতের চিহৃ রয়েছে বলে বিষয়টি নিশ্চিত করে কোতয়ালী মডেল থানার এস আই নজরুল ইসলাম। আর তিনিই ঐ নারীর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন বলে আমরা জানি। এভাবেই চলছে নারীর সুরতহাল। একজন পুরুষ ঘেটেঘুটে দেখছেন নারীর শরীর। ছি লজ্জা! কি লজ্জা!
ঢাকার পাশের নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানায় জড়সড়ভাবে বসে আছে এক কিশোরী। বাবাকে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ লেখাতে এসেছে সে। টেবিলের অন্য দিকে এক পুরুষ সাব-ইনস্পেক্টর ওই কিশোরীর অভিযোগ লিপিবদ্ধ করছেন, আর মাঝে-মধ্যে কলম থামিয়ে ধর্ষণ সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন করছেন কিশোরীটিকে। লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে মেয়েটি। এই দৃশ্য কেবল রূপগঞ্জের নয় গোটা বাংলাদেশের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মহিলাদের উপরে অত্যাচারের অভিযোগ নথিভুক্ত করেন থানার পুরুষ অফিসারেরা। পুলিশ কর্তারা বলছেন, এটা আমাদের জন্যও বিব্রতকর। মহিলা পুলিশ কর্মকর্তার অপ্রত্যুলতার কারনে একজন পুরুষ পুলিশকেই হেন কাজ করতে হয়। বহু ক্ষেত্রে ধর্ষণের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে তদন্তকারীর প্রশ্নবাণে কার্যত দ্বিতীয় বার ‘ধর্ষিত’ হন একজন নারী। সেই পীড়ন থেকে নির্যাতিতাদের বাঁচাতেই সরকার এর আগে পদক্ষেপও নিয়েছিলো কিন্তু তা অকার্যকর। প্রশ্ন হলো দেশের নিগৃহীত নারীরা কবে সরকারের এ নির্দেশ সুযোগ পাবেন? এমন প্রশ্নের জবাব নিশ্চিত করে দিতে পারছেন না পুলিশের উর্দ্ধতন কর্তারাও। কারণ, দেশের সব থানায় তদন্ত করার অধিকারী মহিলা সাব-ইনস্পেক্টর বা অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইনস্পেক্টর জোগান দেওয়াার পরিকাঠামো পুরোপুরি এখনও গড়ে তুলতে পারেনি সরকার।
আমরা মনে করি, কোনও মহিলা অফিসার অভিযোগ নিলে ধর্ষিতারা অনেক স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারবেন। আবার তদন্তকারী অফিসার মহিলা হলে তাঁর সহমর্মিতা পেতে পারেন অত্যাচারিতা। এতে তদন্তের কাজও দ্রুত শেষ হতে পারে। অতিকষ্টের কথা এই যে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগেও ধর্ষণের শিকার নারীর শারীরিক পরীক্ষা করেন পুরুষ চিকিৎসক। ওই চিকিৎসককে সহায়তা করেন পুরুষ ওয়ার্ডবয়। দেশের সবচেয়ে গৌরবময় চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণের প্রমাণপত্র নিতে এসে নারীকে চরম লজ্জা আর অপমানের মুখোমুখি হতে হয় প্রায়ই। ধর্ষণ, হত্যা, দুর্ঘটনার মামলা অথবা ছেলে বা মেয়ের বয়স নির্ধারণে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে সনদ নিতে হয়। আইনের চোখে এ সনদ গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অনেকে মনে করেন, এ দলিল পেতে দ্বিতীয়বার ধর্ষণের শিকার হন নারী। তাইতো হচ্ছে! ধর্ষিতার শ্লিলতাহানী কিংবা ধর্ষণ করছে পুলিশ এমন খবরও মাঝে মাঝে আমরা খবরের কাগজে দেখি।
মূলত বাধ্য হয়েই একজন ধর্ষিত নারী পুরুষ ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করাচ্ছে। একজন ধর্ষিতাকে বাধ্য হয়ে একজন পুরুষ পুলিশ অফিসারের কাছে তার লজ্জার কথা অকপটে বলতে হচ্ছে। বিপদে না পড়লে বোধ করি কখনোই একজন নারী পুরুষ ডাক্তারের সামনে পোশাক খুলে বিবস্ত্র হতেন না। ধর্ষণের সেই নির্মম কাহিনীর ধারা বর্ণনা দিতেন না। যখন চিকিৎসক একজন নারীকে শরীরের সব পোশাক খুলে ফেলতে বলেন তখন জীবনটা তার কাছে যন্ত্রণাদায়ক মনে হয় বৈকি। এটা তার জীবনে দ্বিতীয় ধর্ষণও। পরিতাপের বিষয় এই যে শুধু ধর্ষকের শাস্তির জন্য এত কিছু করার পরও সেই মামলায় ধর্ষক বেঁচে যাচ্ছে প্রায় ক্ষেত্রেই। সত্যি বিচিত্র এ দেশ। এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা। স্মরণ রাখতে হবে, আমরা সবাই কোনো না কোনো পরিবারের সদস্য এবং পরিবারে আমাদের সবারই মা, বোন ও মেয়ে রয়েছে। তারা যে কেউ এ পরিস্থিতির মুখোমুখি যদি হয় তখন আমাদের একই কষ্ট লাগবে।
কথা হলো কোনো মহিলা পুলিশ অফিসার অভিযোগ নিলে ধর্ষিতারা অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারবেন। তার ডাক্তারি পরীক্ষা যদি কোনো মহিলা ডাক্তার করেন তবে তার সহমর্মিতা পেতে পারেন অত্যাচারিতা। এতে তদন্তের কাজও দ্রুত শেষ হতে পারে। পারিবারিক নির্যাতন, সহিংসতা, ধর্ষণ, ইভ টিজিং, যৌন হয়রানিসহ নারী ভিকটিমদের সাপোর্ট দিতে নারী পুলিশ কর্মকর্তা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে নারী ভিকটিমরা সব বিষয় শেয়ার করতে পারে না। এ ছাড়া কোনো নারী খুন হলে তার সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করতে পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তাকে সমস্যায় পড়তে হয়। ধর্ষণ, হত্যা, দুর্ঘটনার মামলা অথবা ছেলে বা মেয়ের বয়স নির্ধারণে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে সনদ নিতে হয়। আইনের চোখে এ সনদ গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অনেকে মনে করেন, এ দলিল পেতে দ্বিতীয়বার ধর্ষণের শিকার হন নারী। অবাক করার বিষয় যে দেশের কোনো হাসপাতালেই নারীর শারীরিক পরীক্ষার জন্য পৃথক কক্ষ নেই। চিকিৎসকদের বসার কক্ষের পুরুষ চিকিৎসক পুরুষ ওয়ার্ডবয়ের সহযোগিতায় সেই টেবিলের ওপর ধর্ষণের শিকার নারীকে রেখে তার পরিধেয় কাপড় খুলে শারীরিক পরীক্ষা করেন। আর এভাবে পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে আঁতকে ওঠেন সবাই। পরীক্ষার আতঙ্কে অনেকে অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়া থেকে বিরত থাকেন। অতি সম্প্রতি সবুজবাগ থানার সহকারী পুলিশ পরিদর্শক বিকাশ কুমার ঘোষ আদালতের নির্দেশে বয়স নির্ধারণের জন্য একটি মেয়েকে ফরেনসিক বিভাগে আনেন। খোলা বারান্দার টেবিলের ওপর পুরুষ ওয়ার্ডবয় কাপড় খুলতে শুরু করলেই চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মেয়েটি। জ্ঞান ফেরার পর বয়স নির্ধারণে আর রাজি হননি তিনি। পত্রিকার খবরে দেখেছি টাকা দিতে রাজি হলে হাসপাতালের অন্য বিভাগ থেকে নারী চিকিৎসক এনে পরীক্ষা করানো হয়। টাকা বেশি দিলে ওই দিনই পরীক্ষা সনদও পাওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় অভিভাবকদের কাছ থেকে। টাকা খরচ না করলে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় ধর্ষণ কিংবা বয়স নির্ধারণের প্রতিবেদনের জন্য। এটা দুঃখজনক।
প্রশ্ন হলো কেন এই পদক্ষেপ? কোনো কোনো পুলিশ কর্তাকে বলতে শুনি, এসব মামলা তদন্ত সম্পন্ন করতে গিয়ে তারাও বিব্রত হচ্ছেন। এটা পুরোপুরি অমানবিক। বহু ক্ষেত্রে ধর্ষণের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে থানার তদন্তকারী কর্মকর্তার অশ্লীল প্রশ্নবাণে কার্যত দ্বিতীয়বার ‘ধর্ষিত’ হন ধর্ষিতা। সেই পীড়নকে আমরা কেন যৌন নিপীড়ন বলব না? এ থেকে নির্যাতিতাদের বাঁচাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ লজ্জাটা শুধু ধর্ষিতা অসহায় অবলা নারীর লজ্জা তা বলব না। এটা আমাদের লজ্জা; এটা রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের লজ্জা; এ লজ্জা রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর। সর্বোপরি বলব, এ লজ্জা দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির লজ্জা। তা বলা বোধ করি অত্যুক্তি হবে না। বিষয়টি গোটা দেশবাসীর জন্যই লজ্জার। নারীর প্রতি সমঅধিকার, নারী বৈষম্য, নারী নির্যাতন, সব কর্মে নারীর সমান সুযোগ, নারী শিক্ষার উন্নতি জাতীয় ব্যাপক নীতিকথার বুলি কচলান আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা। তাদের সেই নীতি যে কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে তার প্রমাণ তো এই লেখাতেই মিলছে।
আমাদের দেশের নারী অধিকারের পরিপন্থী যেসব রীতিনীতি রয়েছে তার অন্যতম হলো- ধর্ষণ মামলায় আইনি প্রতিকারের জন্য পুরুষ ডাক্তার কর্তৃক ধর্ষিতার শরীর পরীক্ষা। বারবার এ সমস্যা সমাধানের তাগিদ আসে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু প্রতিকার হচ্ছে না। আমার এক আইনজীবী বন্ধুর মতে, নারী ও শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হলে অপরাধ প্রমাণ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূূর্ণ ও কার্যকর প্রমাণ হিসেবে নাকি ডাক্তারী পরীক্ষার সনদপত্রকে বিবেচনা করা হয়। সনাক্তকৃত আলামত অভিযুক্তের কি-না তা প্রমাণ করার জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে। বাস্তবে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনসহ অন্যান্য শারীরিক নির্যাতন প্রতিকারে মেডিকেল পরীক্ষার ব্যবস্থা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট সহায়ক নয়। আইন বা রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা যথাযথভাবে পালিত না হওয়ার জন্যই নির্যাতিতরা ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে একদিকে যেমন বি ত হয়, অন্যদিকে অপরাধীরা উৎসাহিত বোধ করে। এ বিষয়টিও আমাদের ভেবে দেখতে হবে।
এ দেশের ধর্ষিতারা বছরের পর বছর ধরে বিচার চাইতে গিয়ে ফের শ্লীলতাহানির শিকার হলেও দেশের বিবেকবান মানুষ কেন প্রতিবাদী হচ্ছে না? মানুষের অন্তর চক্ষুতে কেন উপরোক্ত ঘটনা ধরা পড়ে না? তাদের বিবেক কেন জাগ্রত হয় না? নাকি ভেবে নেওয়া যায় কোনো বিবেকবান মানুষ এ পর্যন্ত এ দেশে জন্মই হয়নি? হলে তারা; আমরা কেন আজ চুপটি মেরে; ঘাপটি মেরে আছি। এ জন্য দায়ী কে? মনে করা স্বাভাবিক এ দায় আমাদের বিবেকের দায়। প্রশ্ন হলো, আমাদের বিবেক কেন জাগ্রত নয়?

লেখক- মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিষ্ট।






Related News

Comments are Closed