Main Menu

বিমানবন্দরে ছুরি নিয়ে হামলা

1445845941ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের সামনে ছুরি নিয়ে এক যুবকের হামলায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্য নিহত হয়েছেন। আনসার ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) আরও তিন সদস্য আহত হয়েছেন। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা ওই যুবককে আহত অবস্থায় আটক করেন।

গতকাল রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালে এ ঘটনা ঘটে। ওই হামলাকারীকে আটকাতে নিরাপত্তাকর্মীদের গুলিও ছুড়তে হয়েছিল। বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এ সময় ভেতরে থাকা যাত্রী, বাইরে তাঁদের বিদায় দিতে আসা আত্মীয়স্বজন এবং ভেতরে ঢোকার জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা হুড়োহুড়ি করে এদিক-সেদিক ছোটেন।

শাহজালাল বিমানবন্দরে নিরাপত্তার ঘাটতির প্রশ্ন তুলে চলতি বছর অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ থেকে বিমানে সরাসরি পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর বিমানবন্দরের পণ্য ও যাত্রীদের নিরাপত্তা তল্লাশির কাজে ব্রিটিশ একটি নিরাপত্তা কোম্পানিকে নিযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া বছর খানেক ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়। এমনই প্রেক্ষাপটে গতকালের এ ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে।

তবে গতকাল রাত নয়টায় এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, এটা জঙ্গি বা সন্ত্রাসবাদী হামলা কি না, তা তখন পর্যন্ত তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেননি।

নিহত আনসার সদস্যের নাম সোহাগ আলী (২৪)। তাঁর বুকের বাঁ পাশে হামলাকারীর ছুরির আঘাত লাগে। আহত অবস্থায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাত সাড়ে সাতটায় চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আনসারের আহত আরেক সদস্য সহকারী প্লাটুন কমান্ডার (এপিসি) জিয়াউর রহমানকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহত এপিবিএনের দুই সদস্য কনস্টেবল আশিক ও কনস্টেবল ইশতিয়াককে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ঘটনা সম্পর্কে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ৬টা ৩৭ মিনিটের দিকে হলুদ গেঞ্জি ও কালো প্যান্ট পরা এক যুবককে ছুরি হাতে ২ নম্বর বহির্গমন টার্মিনালের ড্রাইভওয়ের উত্তর প্রান্তের ৬ নম্বর গেটের সামনে দেখতে পান এপিবিএনের সদস্যরা। তাঁরা তখন ‘ধর ধর’ বলে চিৎকার করে উঠলে ওই যুবক ড্রাইভওয়ে ধরে দক্ষিণ দিকে দৌড় দেন। ৪ নম্বর গেটের সামনে এক আনসার সদস্য ধরার চেষ্টা করলে তাঁকে ওই যুবক ছুরিকাঘাত করেন এবং সামনের দিকে এগোতে থাকেন। ৩ নম্বর গেটের সামনে আরেক আনসার সদস্য তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করেন। তখন যুবকটি ওই আনসার সদস্যকেও ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত করেন। এরপর রক্তাক্ত ছুরি হাতে যুবকটি ৩ নম্বর গেট দিয়ে টার্মিনালের ভেতরে ঢুকছিলেন, এমন সময় তাঁর পা লক্ষ্য করে গুলি করেন এপিবিএনের এক সদস্য। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। আক্রমণকারী যুবক ভেতরে ঢুকে পড়েন। ২৫-৩০ পা ভেতরে ঢোকার পর এপিবিএন ও আনসার সদস্যরা তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। তখন ওই যুবক এলোপাতাড়ি ছুরি চালাতে থাকেন। এতে এপিবিএনের দুই সদস্য আহত হন। তবে সেখানেই আক্রমণকারী যুবককে ধরে ফেলেন। এ সময় বহির্গমন টার্মিনালে থাকা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনাস্থলে থাকা আনসার কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি গিয়ে দেখি সোহাগ ৪ নম্বর গেটের সামনে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তার শরীর থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে। তখন বিদেশগামীদের বিদায় জানাতে আসা উপস্থিত লোকজনের সহায়তায় সোহাগকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসি। চিকিৎসকেরা ইসিজি করার পর সোহাগকে মৃত ঘোষণা করেন।’

এদিকে হামলাকারী যুবককেও আটকের পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা দিয়ে রাত সোয়া নয়টায় অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ সময় তাঁর মাথায় ও ডান পায়ের ঊরুতে ব্যান্ডেজ দেখা গেছে। ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির জন্য যে টিকিট করা হয়, তাতে ওই যুবকের নাম শিহাব, বয়স ২০ বছর লেখা হয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, কুর্মিটোলা হাসপাতালে নেওয়ার পর আটক যুবক নিজের নাম বলেছেন শিহাব। এর বাইরে তাঁর সম্পর্কে আর কোনো তথ্য গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ পায়নি।

এদিকে খবর পেয়ে আনসারের নিহত সদস্যকে দেখতে রাতে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে আসেন আনসারের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মিজানুর রহমান খান। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘হামলাকারীর পরিচয় সম্পর্কে আমরা এখনো নিশ্চিত নই। তাকে ঢুকতে বাধা দেওয়া নিয়ে কথা-কাটাকাটির সময় ছুরি মেরে বসে। হামলাকারীকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’

এ ঘটনায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়বে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে মিজানুর রহমান খান বলেন, ‘যে জায়গা থেকে মানুষের চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, তল্লাশি হয়, সেখানেই কিন্তু আমার ছেলেরা তাকে আটকে দিয়েছিল। তাকে ভেতরে যেতে দেয়নি বলেই ছেলেটাকে (সোহাগ) মরতে হয়েছে। জীবন দিয়ে হলেও আমার ছেলেরা পেরেছে। এই কৃতিত্বের দাবিদার তারা হতেই পারে।’

বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় থাকা এপিবিএনের পুলিশ সুপার তানজিনা আক্তার  বলেন, হামলাকারী ওই যুবকের গায়ে বিমানবন্দরের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বে থাকা এ কে ট্রেডার্সের কর্মীদের মতো পোশাক ছিল।

তবে ওই যুবক সত্যিই পরিচ্ছন্নতাকর্মী কি না, সে ব্যাপারে গত রাত পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রাতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এ ঘটনায় বিমানবন্দরের ফ্লাইট পরিচালনাসহ অন্যান্য কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। সব কার্যক্রম স্বাভাবিক আছে। এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তবে রাতে বিদেশগামী যাত্রীদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, এ হামলার পর রাতে বহির্গমনের অল্প কয়েকটি প্রবেশপথ খোলা রেখে যাত্রীদের ভেতরে ঢোকানো হয়েছে। এ সময় অনেক যাত্রী ও তাঁদের স্বজনেরা নিরাপত্তাকর্মীদের দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন বলে কয়েকজন প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেছেন।






Related News

Comments are Closed