Main Menu

তিন দিন পর এলাকায় গিয়ে সাংবাদিক ও হিন্দুদের হুমকি দিলেন মন্ত্রী

1478091705150প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিরা ছিল নিষ্ক্রিয়। তা-বের ৭২ ঘণ্টা পর নিজ এলাকায় যান স্থানীয় এমপি ও মৎস্যমন্ত্রী ছায়েদুল হক। আর তিনদিন পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি। হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে তা-বের ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে গাফিলতির দায়ে থানার ওসি আবদুল কাদেরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, মন্দিরে হামলার ঘটনার সময় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদাসীনতা, নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা ছিল বলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে অভিযোগ করেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর তা-বের ৭২ ঘণ্টা পর নিজের নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে সংসদ সদস্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক দাবি করেন, ‘নাসিরনগরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সাংবাদিকরাই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করে তুলছেন।’ পাশাপাশি তিনি এ ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বাড়াবাড়ি না করতে সতর্ক করেছেন।

এদিকে গতকাল মানবাধিকার কমিশন, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা এবং জেলা আওয়ামী লীগের

সভাপতি ও জেলা সদরের সংসদ সদস্য র.আ.ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামালের নেতৃত্বে নাগরিক কমিটি, ড. এনামুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে মানবাধিকার কমিশন ও হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাস গুপ্তের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল পৃথক পৃথকভাবে উপজেলার হরিপুর ও নাসিরনগর সদরের ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পরিদর্শন করেন। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন। পরিদর্শনকালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘সুষ্ঠু তদন্ত করে এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’

গতকাল সকালে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী উপজেলার হরিপুর গ্রামে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও মন্দির পরিদর্শন করেন। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাস গুপ্ত নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ও উপজেলা সদরের বিভিন্ন মন্দির ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ ও সংসদের বাইরে বারবার বলেছেন, তার দল আগাছায় ভরে গেছে। নাসিরনগরের স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক সেই আগাছায় পড়েন কি না সেটিও ভেবে দেখার বিষয়। বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন জানাই।’

রানা দাস গুপ্ত অভিযোগ করেন, ‘নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর মন্দিরে হামলার ঘটনার সময় প্রশাসনের ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদাসীনতা, নিষ্ক্রিয়তা ও রাজনৈতিক মহলের নিষ্ক্রিয়তায় আমরা বিচলিত ও বেদনাহত। এই ঘটনা ‘৭১কে স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা তার তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাই।’ তিনি সরকারিভাবে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনসহ ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির সমূহের সংস্কার করার দাবি জানান।

২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে যেসব ঘটনাগুলো ঘটেছে নাসিরনগরের ঘটনাটি তারই ধারাবাহিকতা বলে অভিযোগ করে রানা গুপ্ত বলেন, ‘গুলশানের হলি আর্টিজানের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। নাসিরনগরের হামলার ঘটনাকে হালকা অথবা লঘুভাবে বিবেচনা করা কোনভাবেই ঠিক হবে না। যদি লঘুভাবে বিবেচনা করা হয় তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও বড় হামলার মুখোমুখি হবে আমরা অনুমান করতে পরি।’ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দল ও প্রশাসন একই সাথে তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার চক্রান্তকারীরা এর মধ্যেই অবস্থান করছে কি না। আমরা সবাই চাই মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাংলাদেশটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হোক।’

হিন্দু সমপ্রদায়ের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় নাসিরনগর থানার ওসি আবদুল কাদের প্রত্যাহার করে করে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন বলেন, ‘গত রোববারের ঘটনার পর থেকেই দায়িত্বে অবহেলার জন্য ওসিকে প্রত্যাহার দাবি করে আসছিল ক্ষতিগ্রস্ত লোকেরা ও জেলা আওয়ামী লীগ।’

ছায়েদুল হকের দাবি : নাসিরনগরের পরিবেশ সাংবাদিকরাই অস্বাভাবিক করে তুলছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় এমপি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক। গতকাল দুপুরে উপজেলার ডাকবাংলোতে মন্ত্রীর কাছে বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেন। মন্ত্রী বলেন, ‘নাসিরনগরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক, আপনারা অস্বাভাবিক করে তুলছেন। আমি সার্বক্ষণিক এলাকার সব খোঁজ-খবর রাখছি।’

ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার ছবি পোস্ট করাকে কেন্দ্র করে গত শনিবার নাসিরনগর উপজেলা হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামে জগন্নাথ দাসের ছেলে রসরাজ দাসকে (৩০) স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে আসে স্থানীয় একদল লোক। যদিও রসরাজ দাস বলছে সে অশিক্ষিত, ফেসবুক চালাতে পারে না। সে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। রসরাজকে আটক করার খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। এ ঘটনায় শনিবার রাতেই রসরাজের বিরুদ্ধে নাসিরনগর থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা দায়ের করা হয়।

এ ঘটনায় রোববার উত্তেজিত জনতা উপজেলা সদরে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ করে প্রায় শতাধিক হিন্দু বাড়ি-ঘর এবং দত্তবাড়ি মন্দির, জগন্নাথ বাড়ি মন্দিরসহ ৮টি মন্দিরে হামলা ও ভাংচুর করে। হামলাকারীরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শতাধিক বাড়ি-ঘর ভাঙচুর ও লুটতরাজ করে। পরে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যরা বিকেল ৩টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।






Related News

Comments are Closed