Main Menu

ফরিদপুরে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর অসংখ্য স্মৃতিচিত্র

imagesজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিপুল স্মৃতিবিজড়িত ফরিদপুর। গোপালগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর জন্ম হলেও ফরিদপুরে রয়েছে তার অসংখ্য স্মৃতি। একজন ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক নেতা এবং কারাবন্দি হিসেবে অনেকবার তিনি ফরিদপুর জেলা সদরে এসেছেন। গোপালগঞ্জ ছিল সে সময়ে ফরিদপুর জেলার একটি মহকুমা।
পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধু নানা প্রয়োজনে কমপক্ষে বিশবার ফরিদপুরে এসেছেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এবং বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস.এম নুরুন্নবী তার মৃত্যুর আগে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট রাজনৈতিক সহকর্মী। মরহুম নুরুন্নবী মারা যাবার আগে গত বছরে ১৬ আগস্ট বাসস ফরিদপুর সংবাদদাতাকে বলেছিলেন, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। এ সময় তরুণ শেখ মুজিব ফরিদপুর সদর মহাকুমার নির্বাচনে প্রচারণা চালাতে নিবাচনী প্রচারণা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে জেলার ভাঙ্গা এলাকায় এসেছিলেন। এ সময় তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন। নুরুন্নবী বলেন, শেখ মুজিব কখনো পায়ে হেঁটে এবং কখনো বাইসাইকেলে চড়ে মুসলিম লীগ প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। নুরুন্নবী সে সময়ের বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে বলেন, তরুণ শেখ মুজিব সে সময়ে নির্বাচনী প্রচারণা কাজে ব্যস্ত থাকায় তাকে কখনো অনাহারে অথবা অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়েছে। তিনি তার রাজনৈতিক পরামর্শদাতা এইস এস সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশনা অনুয়ায়ী মুসলিম লীগের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য ছিল অপরিহার্য।
তবে ভারত বিভক্তির পর সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের শাসকদের কর্মকান্ডে বঙ্গবন্ধু হতাশা ব্যক্ত করেন এবং সে সময়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের লোকদেরকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে। পাকিস্তানী শাসকরা বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন চালানো শুরু করলো। তিনি বুঝতে পারলেন, পাকিস্তানী শাসকরা বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পরিবর্তন করতে চাচ্ছে। তারা একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাঙালিদের ওপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এ জন্য পাকিস্তানী শাসকরা বাঙালির জীবনের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার নীতি অনুসরণ করলো।
পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে যেয়ে বঙ্গবন্ধুকে অনেকবার কারাগারে যেতে হয়েছে। ১৯৫০ সালে একবার বঙ্গবন্ধুকে গোপালগঞ্জের কারাগার থেকে এক মাসের জন্য ফরিদপুর কারাগারে পাঠানো হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা কারাগার থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পুনরায় ফরিদপুর কারাগারে পাঠানো হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। কারাগার থেকে মুক্তি পাবার পর কারাগেটেই তাকে বিরোচিত সংবর্ধনা দেন তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা। এ সময়ে সেখানে নুরুন্নবী, অপর আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম ইমামউদ্দিন আহমেদ, মরহুম শামসুদ্দিন মোল্লা, মরহুম লিয়াকত হোসেন, মরহুম আমিনুল ইসলাম মজনু উপস্থিত ছিলেন।
নুরুন্নবী সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়েই তাদের সাথে একান্ত আলোচনায় বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে এক সাথে থাকা সম্ভব হবে না। নুরুন্নবী বলেন, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রথম দিক থেকেই বাঙালিদের জন্য একটি পৃথক আবাস ভূমি প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
নুরুন্নবী বাসস সংবাদদাতাকে জানান, বঙ্গবন্ধু পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ফরিদপুর শহরে স্থানীয় ঐতিহাসিক অম্বিকা ময়দান, রাজেন্দ্র কলেজ মাঠ এবং স্টেডিয়ামে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখার জন্য প্রায়ই ফরিদপুরে আসতেন। এ সকল জনসভায় পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানে দুঃশাসনের তীব্র সমালোচনা করতেন। সমাবেশ শেষে তিনি তিনি রাতে শহরে তার কোন না কোন নিকট-আত্মীয় অথবা কোন রাজনৈতিক সহকর্মীর বাসায় থাকতেন অথবা শহরের ঝিলটুলিস্থ জেলা বোডের্র ডাক বাংলোতে থাকতেন।
বঙ্গবন্ধুর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের কয়েক জন সহপার্টির মধ্যে ছিলেন, এডভোকেট শামসুদ্দিন মোল্লা। তিনি দু’বার এমপি নির্বাচিত হন এবং তিনি ছিলেন ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ১৯৭৫ সালে তিনি ফরিদপুরে গভর্নর নির্বাচিত হন। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের বঙ্গবন্ধুর অপর রুমমেট এডভোকেট সরওয়ারজান মিয়া ষাটের দশকে মুসলিম লীগ থেকে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন এবং দেশ স্বাধীন হবার পর পরবর্তীতে তিনি বিএনপি’র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কয়েকবার ফরিদপুরে আসেন। এ সময়ে তার রাজনৈতিক সহকর্মী দলীয়কর্মী এবং সকল পযার্য়ের বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। এদের মধ্যে অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেনও ছিলেন। তিনি ফরিদপুর ইয়াসিন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ফরিদপুর ১ আসন থেকে আওয়ামী লীগ টিকিটে এমপি নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন তিনি। এ সময় অধ্যক্ষ দেলোয়ার অসুস্থ ছিলেন। স্থানীয় সাকির্ট হাউসে বঙ্গবন্ধুর সাথে আলাপকালে তিনি ফরিদপুরে একটি মেডিকেল কলেজ করার অনুরোধ জানান। জবাবে বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন, মেডিকেল কলেজ যে ক’টি আছে, অর্থসংকটে এ ক’টি চালাতেই হিমশিম খাচ্ছি। বেশির ভাগ অর্থই ব্যয় করতে হচ্ছে এক কোটির অধিক মানুষের পুনর্বাসনের জন্য। যুদ্ধের সময়ে এ সকল লোক দেশ ছেড়ে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যায়। এ সকল লোককে খাওয়াতে খাদ্য কিনতে হচ্ছে। পাকিস্তানের সৈন্যরা ৯ মাসের যুদ্ধের সময়ে সবকিছু ধ্বংস করে গেছে। ফলে এ মুহূর্তে দেশে নতুন কোন মেডিকেল কলেজ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।
১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারি আসেন চন্দনা বারাসিয়া নদী পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করতে। এ সময় অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন এই এলাকার এমপি ছিলেন।
বর্তমান সরকারের সময়ে এসে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব, জেলা প্রশাসন এবং কারা কর্তৃপক্ষ ফরিদপুর জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে পুরাতন ভবনের পাশে বঙ্গবন্ধুর একটি মুরাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনের রসময়ে কয়েকদিন এই কারাগারে ছিলেন। ১৯৫০ সালেও তিনি ডিভিশন বন্দি হিসাবে এক মাস কারা হাসপাতালে ছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ বাসসকে জানান, বঙ্গবন্ধুর মুরাল নিমার্ণের জন্য একটি বরাদ্দপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। গত শনিবার শহরে আয়োজিত এক জঙ্গিবিরোধী র‌্যালীতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এলজিআরডি এবং সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দোকার মোশাররফ হোসেন বলেন, মুরাল নির্মাণ কাজ খুব শিগগির শুরু হবে। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি খুব কম সংখ্যক লোক জানেন। ফরিদপুরে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্টজনদের মধ্যে এখন মাত্র কয়েকজন বেঁচে আছেন।






Related News

Comments are Closed