Main Menu

মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে মন্তব্যের কারণে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সমন

b22373ae77af5c29a4394d098619eafa-10মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে মন্তব্যের কারণে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এক আইনজীবীর করা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা আমলে নিয়ে সমন জারি করেছেন আদালত। আগামী ৩ মার্চ তাঁকে আদালতে হাজির হতে হবে।
ঢাকার মহানগর হাকিম মো. রাশেদ তালুকদার এই আদেশ দেন।
গতকাল সোমবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে দণ্ডবিধির ১২৩(ক)/১২৪(ক)/৫০৫ ধারায় মামলাটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মমতাজ উদ্দিন আহমদ। তিনি আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদেরও সদস্য। এর আগে তিনি মামলা করার জন্য নিয়মানুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে, এই মামলাটিসহ গত পাঁচ বছরে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ৩৬টি মামলার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১০টিই বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এ মামলা করানো হয়েছে। গতকাল রাজধানীতে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে এ মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল আরও বলেন, খালেদা জিয়া বাইরে থাকলে সরকারের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। সরকার খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরাতে চায়।
গত ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। আজকে বলা হয়, এত লাখ লোক শহীদ হয়েছে। এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ না করে খালেদা জিয়া দাবি করেন, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না।
এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গতকাল দলের সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিএনপি যদি বাংলাদেশে বাস্তবমুখী রাজনীতি করতে চায়, তাহলে ঐতিহাসিক সত্য মানতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুকে মানতে হবে।
গতকাল আদালতে বাদীপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনজীবী সাহারা খাতুন, কাজী নজিবুল্লাহ, এ এফ এম রেজাউল করিম, ওমর ফারুক আসিফ প্রমুখ। আদালতে তাঁরা বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। তিনি জাতির পিতা ও আওয়ামী লীগ নিয়েও বিরূপ মন্তব্য করেছেন। এটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল বলে মনে করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আইনি নোটিশ দেওয়ার পরও তিনি ক্ষমা চাননি বা বক্তব্য প্রত্যাহার করেননি।
আইনজীবীরা আরও বলেন, খালেদা জিয়ার মন্তব্যের পর মমতাজ উদ্দিনের একটি আবেদন পর্যালোচনা করে বিএনপির চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার অনুমতি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাই আরজিতে মামলা আমলে নেওয়ার পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানারও আবেদন করা হয়েছে।
গতকাল দুপুরে আদালত খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সমন জারির পরপরই বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত চত্বরে বিক্ষোভ করেন।
খালেদা জিয়ার বক্তব্যে রাষ্ট্রদ্রোহের কিছু নেই বলে দাবি করেছেন তাঁর আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি বলেন, দণ্ডবিধির ১২(ক) ধারায় রাষ্ট্রদ্রোহের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, খালেদা জিয়ার বক্তব্য এ সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। রাষ্ট্রদ্রোহ হয় যদি কেউ সরকার উৎখাতের চেষ্টা করে। যদি কেউ সরকারের প্রতি জনগণকে উসকে দেওয়ার জন্য বক্তৃতা দেয়, তাহলে সেটা রাষ্ট্রদ্রোহ। এখানে খালেদা জিয়া কোনো রাষ্ট্রদ্রোহ করেননি।
তবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ রাষ্ট্র হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, শহীদদের রক্তে। এ জন্য রাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের আত্মত্যাগ একসঙ্গে দেখতে হবে। শহীদের সংখ্যা নিয়ে কটাক্ষ করা মানে এই রাষ্ট্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে কটাক্ষ করা। এর চেয়ে বড় রাষ্ট্রদ্রোহ আর কী হতে পারে?’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মমতাজ উদ্দিন ওই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করতে সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কাছে সহায়তা চান। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন ওই আইনজীবী। মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার তাঁকে মামলা করার অনুমতি দেয়।
পাঁচ বছরে আরও ৩৫টি মামলা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র থেকে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আরও ৩৫টি মামলার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধেই হয়েছে ১০টি মামলা। রাষ্ট্রদ্রোহ ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র মামলা হয়েছে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার বিরুদ্ধেও।
দণ্ডবিধির ষষ্ঠ অধ্যায়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধগুলোর সংজ্ঞা ও এর সাজা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে ১২১ থেকে ১২৬ ধারার মধ্যে উল্লিখিত অপরাধগুলোকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২৪ক ধারাকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলা হচ্ছে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ১২১ থেকে ১২৬ ধারায় করা সব মামলাকে আমলে নেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের দুজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো হয়েছে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। এসব মামলার কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণা হয়েছে—এমন নজির পাওয়া যায় না।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কোনো মামলার রায় হয়েছে—এমন নজির আমার জানা নেই। মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়, পরে আর এসব মামলার কোনো খবর থাকে না।’
১৯৯১ সালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আন্দোলন গড়ে তোলে। তখন বিএনপি সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেছিল। ১৯৯৪ সালে ওই মামলা মাথায় নিয়েই জাহানারা ইমাম মারা যান। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে জাহানারা ইমামসহ অন্যদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়।






Related News

Comments are Closed