Main Menu

জাতীয় পার্টিতে নতুন জাগরণ

মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি ২০১৬ : ছোট ভাই জিএম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করার মধ্য দিয়ে নতুন বছরের শুরুতেই রাজনীতিতে চমক সৃষ্টি করলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পাশাপাশি তাকে নিজের উত্তরসূরি ঘোষণা করে পার্টির নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের চাওয়াও পূরণ করলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, সোমবার রংপুরে জাতীয় পার্টি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আজ থেকেই জিএম কাদের দলের কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া আমার অবর্তমানে দলের হালও ধরবেন তিনি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এই আকস্মিক ঘোষণা মুহূর্তেই কেন্দ্র থেকে দলের তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। সৃষ্টি হয় নতুন করে আশার আলো। ক্ষুদ্র একটি অংশ মনোক্ষুণ্ণ হলেও উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন জাতীয় পার্টির বেশিরভাগ নেতাকর্মী। তাদের মতে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দলের ভেতরকার একটি পক্ষ এরশাদকে কোণঠাসা করে রেখেছিল। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পার্টি চেয়ারম্যানের এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুধু জাতীয় পার্টির সাধারণ নেতাকর্মীরা নতুন করে উজ্জীবিত হবেন না, এর বহুমাত্রিক রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত বিষয়টি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে তারা মনে করেন, এরশাদ যদি তার চমক সৃষ্টিকারী নতুন এ ঘোষণা কার্যকরভাবে ধরে রাখতে পারেন তবে ভবিষ্যৎ ভোটের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ ফেলতে সক্ষম হবে দলটি। দলকে শক্তিশালী করে সামনে এগিয়ে নিতে পারলে জাতীয় নির্বাচনের সময় এরশাদের ট্রামকার্ড গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দিতে পারে।

এদিকে দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের অনেকে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, জিএম কাদেরকে মূল নেতৃত্বে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত যথেষ্ট সময়োপযোগী। যখন জাতীয় পার্টি ‘সরকারি দল না বিরোধী দল’ এমন প্রশ্নে জর্জরিত ঠিক সেই মুহূর্তে এরশাদের এ ঘোষণা পার্টির অভ্যন্তরে ইতিবাচক উন্মাদনা তৈরি করেছে। তাদের ধারণা, দল সঠিক পথে এগোতে পারলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ঘিরে থাকা বলয়ে শক্তি ক্রমেই আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। যার ফলে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতেও নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হবে।

দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও তাই মনে করেন। সোমবার টেলিফোনে যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘এছাড়া আমার হাতে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। নিজের হাতে গড়া দলটি তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে, জীবদ্দশায় তা মেনে নিতে পারি না। তাই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় পার্টি এখন চরম সংকটের মুখে পড়েছে। জাতীয় পার্টি আছে কি নেই, সেটা দেশের মানুষ জানেন না। দেশের মানুষ লাঙ্গলের নাম ভুলতে বসেছেন। দলকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না।’ সাবেক এই রাষ্ট্রপতি জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী এবং কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার দলের তিনজন সংসদ সদস্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। আমি নিজেও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমরা বিরোধী দলে আছি, না সরকারি দলে আছি, দেশের মানুষ তা বুঝতে পারছেন না।’ তিনি বলেন, ‘এ অবস্থার অবসান এবং জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করতে হলে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং আমাকে পদত্যাগ করতে হবে। দেশের মানুষও তেমনটাই আশা করে। মানুষ জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী এবং কার্যকর রাজনৈতিক দলের ভূমিকায় দেখতে চায়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগামী এপ্রিলে দলের যে ত্রিবার্ষিক সম্মেলন হবে সেখানে কো-চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করে তা অনুমোদন করে নেয়া হবে।’

এদিকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এ উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন দেশের বিশিষ্টজনরাও। জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘এরশাদ সাহেব সবদিকেই কথা বলেন। কোনটা তার মনের কথা আর কোনটা তার কথার কথা তা কেবল তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমরা চাই, জাতীয় পার্টি সত্যিকারের এবং কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করুক। দেরিতে হলেও এরশাদ সাহেব সেই সত্যটা উপলব্ধি করেছেন। মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসার কথা ভাবছেন। এই শুভ চিন্তার জন্য তাকে ধন্যবাদ।’

জিএম কাদেরকে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি (জিএম কাদের) অত্যন্ত সজ্জন, বিনয়ী এবং আন্তরিক। আওয়ামী লীগের আগের মেয়াদে মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু কেউ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ উত্থাপন করতে পারেননি, যা একজন রাজনীতিবিদের জন্য বড় পাওয়া।’ ড. বদিউলম আলম মজুমদার আরও বলেন, ‘যতটুকু চিনি জানি, জিএম কাদেরের রাজনৈতিক জ্ঞান, ধ্যান-ধারণা অত্যন্ত স্পস্ট। তিনি যা বিশ্বাস করেন তাই বলেন, করারও চেষ্টা করেন। তাকে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে নিয়ে আসাটা দলের জন্য ভালো হবে।’

হঠাৎ করেই জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এ পরিবর্তন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে থাকা না থাকা নিয়ে নানান নাটকীয়তার কারণে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল দলটি। শেষ পর্যন্ত ৪০ জন সংসদ সদস্য নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে জাতীয় পার্টি। বিরোধীদলীয় নেতা হন তার স্ত্রী ও দলের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ। পাশাপাশি মন্ত্রিসভায়ও যোগ দেয় দলটি। পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ নিজে হন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। তিনজন নেতার স্থান হয় মন্ত্রিসভায়।

একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলে থাকায় দলটি নানামুখী সমালোচনার মুখে পড়ে। দেশে-বিদেশে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই দলটির নেতাদের কাছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও (টিআইবি) জাতীয় পার্টির এ দ্বৈত ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে। নেতাকর্মীদের মধ্যেও দলের এ ভূমিকায় সৃষ্টি হয় চরম হতাশা। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজেও এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার কথা মাঝে মধ্যে প্রায় তুলে ধরেন। জাতীয় পার্টির এমন ভূমিকা নিয়ে রওশন এরশাদের সঙ্গেও বিরোধ দেখা দেয় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রিসভায় থেকে সরকারের কাছ থেকে নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা নিতে দলের একটি ক্ষুদ্র অংশ বরাবরই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। এই অংশটি দলকে শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দেয়ার চেয়ে বেশি মনোযোগী ছিলেন নিজেদের আখের গোছাতে। এ অবস্থায় দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী দীর্ঘদিন ধরেই পার্টি চেয়ারম্যানের একটি শক্ত অবস্থান গ্রহণের আশায় ছিলেন। তবে তার কিছুটা হলেও রোববার দলের চেয়ারম্যান পূরণ করেছেন। তার নতুন ঘোষণা জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে নবজাগরণ সৃষ্টি করেছে বলে তারা মনে মরেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দলের ভেতরে সুবিধাবাদীদের তৎপরতার কারণে জাতীয় নির্বাচনের পর হয়ে যাওয়া উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় পার্টি প্রার্থী দিলেও সাফল্য পায়নি দলটি। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও তথৈবচ। সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনে দলের দৈন্যদশা আরও প্রকট আকারে ফুটে ওঠে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের নজিরবিহীন ভরাডুবি ঘটে। পৌরসভা নির্বাচনে মাত্র ৯৩টি পৌরসভায় প্রার্থী দিলেও জয় পায় শুধু একটিতে। দলের সাংগঠনিক অবস্থাও নাজুক। সারা দেশে মাত্র ২৭টি জেলায় দলটির কমিটি রয়েছে। বাকি জেলাগুলোতে কোনো কার্যকর কমিটি নেই।

এদিকে জাতীয় পার্টির এ রকম অবস্থার জন্য দলের রাজনীতি স্পস্ট না থাকাকেই দায়ী করেন নতুন দায়িত্ব পাওয়া কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের। সোমবার যুগান্তরকে তিনি টেলিফোনে বলেন, ‘রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় জাতীয় পার্টি হারিয়ে যাচ্ছিল। দলের অবস্থা নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এ অবস্থার অবসানে আগে জাতীয় পার্টির রাজনীতি কি- তা স্পষ্ট করতে হবে। জাতীয় পার্টির ভূমিকা কি হবে- তাও পরিষ্কার করতে হবে। জাতীয় পার্টিকে কার্যকর বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করার মধ্য দিয়ে দলটিকে আবার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে।’

দলের গঠনতন্ত্রে কো-চেয়ারম্যানের কোনো পদ নেই- তারপরও আপনাকে এই পদে বসানো হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে জিএম কাদের বলেন, ‘চেয়ারম্যান তার নির্বাহী ক্ষমতাবলে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরবর্তী জাতীয় সম্মেলনে কাউন্সিলরদের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আগামী এপ্রিল মাসের মধ্যেই কাউন্সিল হওয়ার কথা রয়েছে।’

রংপুরের সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির সম্মেলন অনুষ্ঠানের জন্য একটি প্রস্তুতি কমিটিও ঘোষণা করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জিএম কাদেরকে কমিটির আহ্বায়ক ও সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদারকে সদস্য সচিব হিসেবে ঘোষণা করেন তিনি। পার্টি চেয়ারম্যানের এ ঘোষণা সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রেসিডিয়ামের একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, রুহুল আমীন হাওলাদারকে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব করার মধ্য দিয়ে এরশাদ কার্যত দলের মহাসচিব পদে পরিবর্তন আনারও আভাস দিয়ে রাখলেন। কারণ সম্মেলনের সদস্য সচিব থাকেন সাধারণত দলের মহাসচিব। সেখানে মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে বাদ রেখে হাওলাদারকে দায়িত্ব দেয়ায় এমন পূর্বাভাস দানা বেঁধে উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, এটি অন্তর্নিহিত বার্তা, যা লুকিয়ে আছে।

সম্মেলনের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পাওয়ার ঘোষণার পর এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদার সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি সব সময়ই এরশাদের দিকনির্দেশনায় কাজ করি। তিনি যখন যে দায়িত্ব দেন সেটি যথাযথভাবে পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।’ যদিও দলের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু নিজেও মহাসচিব পদে আর না থাকতে চাওয়ার কথা জানিয়েছেন। এ নিয়ে গত কিছুদিন ধরেই দলটির অভ্যন্তরে নানা কথাবার্তা চলছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জিয়াউদ্দিন বাবলু কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদের এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পানিসম্পদমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘তিনি এটা করতে পারেন না। এটা করার আগে প্রেসিডিয়ামের বৈঠক করতে হবে। সেখানেই আলাপ-আলোচনা করে যা করার করতে হবে।’






Related News

Comments are Closed