Main Menu

সোয়া কোটি এনআইডিতে ভুল!

d060ce429ef8c88e9dfd3c2030823cda-300 ভুলে ভরা নির্বাচন কমিশনের তথ্যভাণ্ডার। এখন পর্যন্ত প্রায় সোয়া কোটি ভোটারের জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুল ধরা পড়েছে। এর মধ্যে দেড়লাখের উপরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। এনআইডির তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এনআইডিতে ভুল তথ্য রয়েছে। সাধারণ ভোটারের কার্ডেও অসংখ্য ভুল রয়েছে। সে হিসাবে আনুমানিক এক কোটি ৩০ লাখ এনআইডিতে ভুল তথ্য আছে।
এই ভুল তথ্য সংশোধন করা না হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-পেনশন উত্তোলনে জটিলতা দেখা দিবে। এদিকে, প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় ১০ হাজার মানুষ তাদের তথ্য সংশোধনের জন্য জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগে (এনআইডি) আবেদন করছে। গড়ে ৫ হাজারের মতো আবেদন প্রতিদিন নিষ্পত্তি করছে। ফলে অনিষ্পত্তিকৃত আবেদনের স্তূপ বাড়ছেই।
২০০৮ সাল থেকে দেশে শুরু হয় জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান কার্যক্রম। নামে জাতীয় পরিচয়পত্র হলেও শুধু ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরাই এই পরিচয়পত্র পাচ্ছে। যদিও এই পরিচয়পত্র ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রয়োজনে লাগছে না। ভোট হচ্ছে ছবি সম্বলিত ভোটার তালিকার মাধ্যমে। তবে এই তালিকা নির্বাচনী কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কাউকে সরবরাহ করা হয় না। এমনকি ওই তালিকা প্রণয়নের পর জাল ভোট প্রদানও বন্ধ হয়নি। জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন ও গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এতে করে অনেক জাল-জালিয়াতি বন্ধ সহজ হয়েছে। কিন্তু এই পরিচয়পত্রে প্রতিদিনই ভুল ধরা পড়ছে। ফলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে যাদের জন্ম তারিখ পরিচয়পত্রে ভুল এসেছে তাদের ভুল সংশোধন করতে মারাত্মক জটিলতার তৈরি হয়েছে। অলিখিত বিধান করা হয়েছে, জন্ম তারিখ ও নাম সংশোধন করতে হলে এসএসসি পাসের সনদ লাগবে। যাদের এই সনদ নেই, তারা ভুল সংশোধনের সুযোগ পাচ্ছে না। এমনকি আদালতে গিয়ে এফিডেভিট করে ভুল সংশোধন করা যাচ্ছে না। জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান কার্যক্রম শুরুর সাত বছর চলে গেলেও এখনো অসংখ্য ভোটারের নামের বানান, ঠিকানা অথবা জন্ম তারিখ ও পিতা-মাতার নামের বানান নির্ভুল করতে পারেনি ইসি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ মুসা ইত্তেফাককে বলেন, গত দেড় মাসে এক লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। আরো অর্ধলক্ষাধিক আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। বর্তমানে প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার থেকে ৫ হাজার এনআইডি সংশোধন করা হচ্ছে।
গত ১৫ ডিসেম্বর সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশের পর জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের হিড়িক পড়ে। নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ করতে চাকরিজীবীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে জানানো হয়েছে, যাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্ম তারিখ, নামের বানান ও অন্যান্য তথ্য চাকরির রেকর্ড বুক থেকে ভিন্ন, তাদের বেতন নির্ধারণের আগে নিজ উদ্যোগে অবশ্যই এনআইডি সংশোধন করে নিতে হবে। যে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অনলাইনে যঃঃঢ়ং: িি.িপড়স.নফ. -ঠিকানায় ঢুকে এনআইডি নম্বর, কর্মরত পদ, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, কতগুলো টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড পেয়েছেন তার তথ্য এবং সর্বশেষ স্কেলের তথ্য দিলেই নতুন স্কেলে তার বেতন কত দাঁড়াচ্ছে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসবে। মিলবে অবসর ভাতার তথ্যও। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার আবেদন পড়ছে। ২১ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে দেড় লাখ জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন চেয়েছেন। এই সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যাবে।
গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, আগারগাঁওয়ের ইসলামিক ফাউন্ডেশনে অবস্থিত জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগে এনআইডি সংশোধনে হাজার হাজার সেবা প্রত্যাশীর দীর্ঘলাইন। যাদের অধিকাংশই সরকারি চাকরিজীবী। সেবা প্রত্যাশীদের চাপে সাত তলায় অবস্থিত এনআইডির মূল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। বাইরে হুড়োহুড়ি আর উত্তেজনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে মাইকিং করে সবাইকে ভবন ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়। চাকরিজীবীদের অতিরিক্ত চাপের কারণে একমাস ধরে শুক্র-শনিবারও কাজ চলছে। ইসির অতিরিক্ত ২০ জন কর্মকর্তাসহ শ’খানেক লোক নিয়ে এনআইডি উইং কাজ চালিয়ে গেলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। চাকরিজীবীদের ভুল তথ্যে রীতিমতো বিস্মিত এনআইডির কর্মকর্তারা। বড় কর্মকর্তা থেকে ছোট কর্মচারী-অনেকেই নিজের জন্ম তারিখ, নিজের নাম, বাবা-মার নাম সংশোধন করছেন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা জানান, হঠাৎ সরকারি চাকুরেদের এমন তৎপরতায় এনআইডি সেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধিত এনআইডি নেয়ার তাগিদ দেয়ায় কিছুটা বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি হচ্ছে। বিভিন্ন কাজে জাতীয় পরিচয়পত্র অপরিহার্য হওয়ায় এনআইডি বিভাগে জাতীয় পরিচয়ত্র হারানো, ভুল সংশোধন, তথ্য-উপাত্ত সংশোধন করতে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার আবেদন পড়লেও এখন প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার আবেদন পড়ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে সেবা দেয়ার পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়েও সেবা দেয়া হচ্ছে।
এনআইডির কর্মকর্তারা আরো বলেন, গত সাত বছর ধরে একবারের জন্যও কারও মনে হল না তা সংশোধন করি! বেতন স্কেল ঠিক করতে অর্থ মন্ত্রণালয় সার্কুলার না দিলে তো কখনই কেউ তা সংশোধন করত কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এসএসসির সনদ না থাকার কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণ জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত রয়েছে।
সর্বশেষ হালনাগাদের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ১০ কোটি ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৫৮৯ জন ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে ৯ কোটি ২০ লাখ ভোটারকে জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে ভোটারদের দেয়া হয় জাতীয় পরিচয়পত্র। সে সময়ে ৮ কোটি ১০ লাখ ভোটার পান জাতীয় পরিচয়পত্র। এতোদিন নির্ভুল জাতীয় পরিচয়পত্র বলা হলেও, ওই ৮ কোটি ১০ লাখ ভোটারের এক কোটির বেশি ভোটারের এনআইডিতে ভুল তথ্য আছে। যারা ভুল সংশোধনের আবেদন করছেন তাদের বেশিরভাগই ২০০৮ সালের জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছিলেন।
ইসি সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুল তথ্য আসে দুইভাবে। এর মধ্যে আবেদন ফরম পূরণ করার সময় প্রত্যেক ভোটারকে বলা হয় সঠিক তথ্য নিশ্চিত করার জন্য কিন্তু অধিকাংশই তা করেন না। আবার যারা ডাটা এন্ট্রি করেন, তারাও অনেক সময় গাফলতি করে থাকেন। ফলে কোনো না কোনোভাবেই ভুল তথ্য থেকেই যায়।






Related News

Comments are Closed