Main Menu

আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে ইজতেমার প্রথম পর্ব শেষ

পৌষের শেষ সপ্তাহে কনকনে শীতের সকাল, ঘন কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ। এর মধ্যেও টঙ্গীর তুরাগতীরের দিকে এগিয়ে চলেছে মুসল্লির ঢল। বেলা ১১টা নাগাদ তুরাগতীরে বিশ্ব ইজতেমার ময়দান ও আশপাশের সড়কের তিন-চার কিলোমিটার জুড়ে জনসমুদ্র।
লাখো মানুষের এই কাফেলার মধ্য দিয়ে গতকাল রোববার আখেরি মোনাজাত করে শেষ হয়েছে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। মোনাজাতে মহান আল্লাহর89396c894940679b6f2eb052c92b20e6-33 দরবারে দুই হাত তুলে কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চেয়েছেন মুসল্লিরা। প্রার্থনা করেছেন দেশ-জাতি-মানবতার কল্যাণ ও সমৃদ্ধি।
আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে আখেরি মোনাজাত। সে অনুযায়ী বেলা ১১টা ৮ মিনিটে মোনাজাত শুরু করেন ভারতের শীর্ষস্থানীয় তাবলিগ মুরব্বি মাওলানা সা’দ। তাঁর সঙ্গে লাখো মুসল্লি দুই হাত তুলে ‘আমিন’, ‘আমিন’ ধ্বনি তোলেন। বিশ্ব ইজতেমার ময়দান ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে লাগানো মাইকে সেই ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে।
প্রায় ২৪ মিনিটের এই মোনাজাতে ব্যক্তিজীবনের গুনাহ মাফ, দোজাহানের কল্যাণ কামনার পাশাপাশি নিজের দেশ ও বিশ্বের শান্তি, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সব মানুষের হেদায়েত, অসুস্থদের জন্য রোগমুক্তি, নির্যাতিত ও বিপদগ্রস্তদের পরিত্রাণ, পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেওয়া আত্মীয়স্বজনসহ সব কবরবাসীর রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়।
মোনাজাতে অংশ নিতে সকাল ১০টা নাগাদ ইজতেমার মাঠকে কেন্দ্র করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আবদুল্লাহপুর-আশুলিয়া সড়কের তিন-চার কিলোমিটার এলাকা পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। তুরাগ নদের পাড় দিয়ে বহু নৌকা ভিড়িয়ে মোনাজাতের অপেক্ষায় ছিলেন নদীপথে আসা মুসল্লিরা। ভরে গিয়েছিল আশপাশের দোকান, কারখানা, অফিস ও ঘরবাড়ির ছাদ। যত দূর চোখ যায়, ছিল শুধু মানুষ আর মানুষ। অনেকে খবরের কাগজ, পলিথিন, পাটি, জায়নামাজ বিছিয়ে বসে পড়েছিলেন বিভিন্ন ভবন ও বিপণিবিতানের সামনে, সড়কের পাশে। আখেরি মোনাজাতের জন্য টঙ্গীর আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ অনেক অফিসে ছিল ছুটি। কিছু প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা না করলেও কর্মকর্তাদের মোনাজাতে অংশ নিতে বাধা ছিল না। অনেক নারীও আসেন মোনাজাতে অংশ নিতে।
বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শেষ হওয়ার পর চার দিন বিরতি দিয়ে ১৫ জানুয়ারি শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব। ১৭ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা।
হেদায়েতি বয়ান: গতকাল সকাল নয়টা থেকে মোনাজাতের আগ পর্যন্ত চলে হেদায়েতি বয়ান। বয়ান করেন ভারতের মাওলানা সা’দ। তার বাংলায় তরজমা করেন বাংলাদেশের মাওলানা হাফেজ যোবায়ের। বয়ানে তিনি বলেন, ‘আমিরের ফয়সালা মানা ওয়াজিব। আমিরের শরিয়তসম্মত ফয়সালাগুলো আমরা মেনে চলব। আমিরকে না মানলে মতপার্থক্য কোনো দিন শেষ হবে না।’
বিদেশি মেহমান: ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, জর্ডান, তুরস্ক, লেবানন, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্তত ৯৫টি দেশের তাবলিগ জামাতের সাত হাজারেরও বেশি বিদেশি মেহমান এবারের ইজতেমায় যোগ দেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাবলিগের কাজে বের হওয়ার জন্য ইজতেমার প্রথম পর্বে প্রায় ছয় হাজার জামাত তৈরি হয়েছে বলে আয়োজক সূত্র জানিয়েছে। আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে এসব জামাত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে জানিয়েছে তাবলিগ সূত্র।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্টজনদের মোনাজাতে অংশগ্রহণ: রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে স্বজনদের নিয়ে আখেরি মোনাজাতে শরিক হন। বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ তাঁর গুলশানের বাসায় এবং বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গুলশানে নিজের বাসভবন ‘ফিরোজায়’ বসে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন।
বিশ্ব ইজতেমায় জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সাংসদ জাহিদ আহসান রাসেল, স্বরাষ্ট্রসচিব মোজাম্মেল হক খান, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম আলম ও পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজমত উল্লাহ খান প্রমুখ। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রের কূটনীতিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও আখেরি মোনাজাতে শরিক হন।
মোনাজাতে টিভি, মুঠোফোন ও ওয়্যারলেস সেট: ইজতেমা মাঠে না এসেও মোনাজাতের সময় হাত তুলেছেন অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মানুষ। গত কয়েকবারের মতো এবারও টঙ্গীর ইজতেমাস্থল থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কনফারেন্সের মাধ্যমে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় মসজিদের মাইকে আখেরি মোনাজাত সম্প্রচার করা হয়। এ ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন স্থান ও আশপাশের এলাকায় টেলিভিশন, ওয়্যারলেস সেট ও মুঠোফোনের মাধ্যমে মোনাজাত প্রচার করা হয়। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সরাসরি সম্প্রচারের সুবিধা নিয়ে অনেকে বাসায় বসে মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন। আবার দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেকে ইজতেমাস্থলে অবস্থানকারীর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করেও মোনাজাতে শরিক হয়েছেন।
মোনাজাত শেষে যানজট: মোনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই অসংখ্য মুসল্লি একযোগে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে শুরু করেন। এ কারণে আশপাশের বিভিন্ন সড়কে তৈরি হয় জনজট ও যানজট। অনেকেই পায়ে হেঁটে ফিরতি পথ ধরেন। গাজীপুর ও আশপাশের এলাকার মুসল্লিদের জন্য ইজতেমা ময়দান থেকে চান্দনা চৌরাস্তা এবং মিরেরবাজার পর্যন্ত বিনা ভাড়ায় বিআরটিসি বাসের ব্যবস্থা করা হয়।
আরও পরিবর্তন: মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০১১ সালে ইজতেমাকে দুই পর্বে ভাগ করা হয়। তখন থেকে ৩২টি করে জেলার মুসল্লিরা দুই পর্বে ইজতেমায় অংশ নিয়ে আসছিলেন। এবার এ বিষয়টিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ইজতেমা পরিচালনা কমিটির সদস্য গিয়াস উদ্দিন বলেন, এবার প্রথম পর্বে ১৭টি জেলার মুসল্লিরা অংশ নিয়েছেন। দ্বিতীয় পর্বে অংশ নেবেন ১৫টি জেলার মুসল্লিরা। বাকি ৩২ জেলার মুসল্লিরা অংশ নেবেন ২০১৭ সালের ইজতেমায়। এ বছর যেসব জেলা ইজতেমায় অংশ নিয়েছে, সেসব জেলার মুসল্লিরা আবার ইজতেমায় অংশ নেবেন ২০১৮ সালে






Related News

Comments are Closed