Main Menu

১ মিনিটে ঘোষণা নিজামীর চূড়ান্ত রায়

 

ঢাকা: মাত্র এক মিনিটেই ঘোষণা করা হল নিজামীর মানবতাবিরোধী অপরাধের আপিলের চূড়ান্ত রায়। ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা উভয়পক্ষের (আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ) আপিল আংশিক গ্রহণ করে ফাঁসির রায় বহাল রাখা হল।

রায় ঘোষণা উপলক্ষে আজ সকালেই আপিল বিভাগের এজলাসের আইনজীবীদের আসনে বসেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম, নিজামীর প্রধান আইনজীবী সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, নিজামীপুত্র ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, কাসেমপুত্র ব্যারিস্টার আরমান বিন কাসেমসহ আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যান্য আইনজীবীরা। এসময় গণজাগরণ মঞ্চের কয়েকজন কর্মীও আদালতের এজলাসে প্রবেশ করেন।

বুধবার সকাল ৯টা ৫ মিনিটে আদালতের এজলাসে প্রবেশ করেন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহানসহ চার বিচারপতি। এরপর প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিরা রায় ঘোষণা করতে প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা নিজামীর মামলার আপিলের রায় ঘোষণা শুরু করেন। তখন ঘড়িতে সময় ৯টা ৯ মিনিট (এজলাসের ঘড়ি)। প্রধান বিচারপতি রায় ঘোষণার সময় বলেন, ‘আইটেম নাম্বার ওয়ান। দিজ আপিল অ্যালাও ইন পার্ট।’

তারপর প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘চার্জ নং ওয়ান, থ্রি অ্যান্ড ফোর একুইটাল। চার্জ নং টু, সিক্স, সেভেন, এইট অ্যান্ড সিক্সটিন…।’ অর্থাৎ ট্রাইব্যুনালের দেয়া ৪ অভিযোগের মধ্যে তিন অভিযোগে ( ২,৬ ও ১৬ নং) ফাঁসির সাজা বহাল রাখেন আদালত। ১, ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল সাজা দিলেও সেগুলো থেকে খালাস প্রদান করেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতির এ রায় ঘোষণার সময় ছিল মাত্র ১ মিনিট।

রায় ঘোষণা শেষ হতে না হতেই আদালতের ভিতরে থাকা উৎসুক আইজনীবী, বিচারপ্রার্থী, সাংবাদিক, এ রায় শুনতে আসা মানুষেরা দ্রুতই আদালতের এজলাস ত্যাগ করেন। গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী, আওয়ামীপন্থি আইনজীবী, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরা বের হয়ে মিডিয়ার সামনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

আওয়ামীপন্থি আইনজীবী ও সুপ্রিমকোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ.ম রেজাউল করিম তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট। এ রায়ে জাতি সন্তুষ্ট, আমরা- স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিরা রায়ে খুশি।’

ফাইল ছবি

প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায়ে আমরা অত্যন্ত খুশি। এই রায়ের মধ্য দিয়ে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নির্মমতা ফুটে উঠেছে। সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি হিসেবে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে তার এই দণ্ড বহাল রাখা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, এই ধরনের অপরাধ কখনোই ক্ষমাযোগ্য নয়। একাত্তরে ত্রিশ লাখ শহীদ ও মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যে স্বাধীনতার পতাকা আমরা পেয়েছি, মন্ত্রী-এমপি থাকাকালে সেই পতাকা এই যুদ্ধাপরাধীরা তাদের গাড়িতে ব্যবহার করেছে। এটা আমাদের জন্য ছিল দুঃখজনক।’

রায় ঘোষণা পর এক প্রতিক্রিয়ায় নিজামী পুত্র ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন বলেছেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো মন্তব্য করব না। খন্দকার মাহবুব স্যার প্রতিক্রিয়া জানাবেন।’

সকাল ৯টা ৩৩ মিনিটে সাংবাদিকদের কাছে তিনি টেলিফোনে এ প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করেন। ব্যারিস্টার নাজিব বলেন, ‘আমাদের প্যানেল ল ইয়ারা এ কমেন্টস করবেন। খন্দকার মাহবুব হোসেন স্যার আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের কাছে এর প্রতিক্রিয়া জানাবেন।’

জামায়াতপন্থি আরেক আইনজীবী সুপ্রিমকোর্ট বারের সাবেক সহ-সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমানও প্রতিক্রিয়া জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমি এই মামলার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলাম না, এজন্য ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এই মামলা সংক্রান্ত যেসব আইনজীবী আদালতে মামলা পরিচালনার সাথে যুক্ত ছিলেন তারা হয়ত প্রতিক্রিয়া জানাবেন।’ আপিল বিভাগের রায় প্রকাশের পরপরই তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর আপিলে ফাঁসির দণ্ড বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। চূড়ান্ত রায়ে যে ৪টি অভিযোগে তার ফাঁসি দেয়া হয়েছিল তার মধ্যে তিনটি অভিযোগে ফাঁসি বহাল রাখেন আদালত। এ ছাড়া ১, ৩ ও ৪ নং অভিযোগে খালাস দিয়েছেন আদালত।

বুধবার সকাল ৯টার দিকে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চে নিজামীর আপিল মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য তিন বিচারপতি হলেন- বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

এর আগে এ রায়কে কেন্দ্র ভোর থেকেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয় সুপ্রিমকোর্ট এলাকায়। সুপ্রিমকোর্টের মূলগেট, মাজার গেট, বার কাউন্সিল গেট, আইনজীবী সমিতি ভবন, আপিল বিভাগের সামনে-পেছনেসহ বেশ কয়েকটি জায়গা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে বিচারপ্রার্থীসহ সাধারণ মানুষ ঢোকার ক্ষেত্রে তাদের দেহ তল্লাশি করা হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাবনায় হত্যা, ধর্ষণ এবং বুদ্ধিজীবী গণহত্যার দায়ে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর নিজামীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর বিরুদ্ধে নিজামী আপিল করলে ৮ ডিসেম্বর দু’পক্ষের শুনানি শেষ হয়। ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর আপিলে বিভাগে আসা ষষ্ঠ মামলা এটি। আজ এর চূড়ান্ত রায় হতে যাচ্ছে। ট্রাইব্যুনাল থেকে আপিল বিভাগে আসা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর মধ্যে এর আগে ৫ জনের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে।

২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মতিউর রহমান নিজামীকে ফাঁসির দণ্ড দেন। ১৬টি অভিযোগের মধ্যে আটটি অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাকে ওই দণ্ড দেয়া হয় চারটি অভিযোগে। ২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, সম্পত্তি ধ্বংস, দেশত্যাগে বাধ্য করার অপরাধে নেতৃত্ব দেয়ায় অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়া হয়েছিল।

৭২ বছর বয়সী নিজামী বিগত চার দলীয় জোট সরকারের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। তার আগে ২০০১-০৩ সময়ে ছিলেন কৃষিমন্ত্রী। এর আগে চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর দশ ট্রাক অস্ত্র মামলাতেও তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়।






Related News

Comments are Closed