Main Menu

জাতিসংঘ: দীপ্ত দীপশিখা

uno-11মোস্তফা  হোসেন চৌধুরী
‘জাতিসংঘ’ যখন কেবলমাত্র ধারণা, কোনো বাস্তবতা নয় তখন সেই ১৯৪২ সালে এরকম একটি বিশ্বসংস্থা গঠনের তাগিদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট  উচ্চারন করেছিলেন ‘ইউনাইটেড নেশন্স’। আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা বলি জাতিসংঘ। অনেক দেশে বলে ‘রাষ্ট্রসংঘ’। বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারেরা মিলে এ সংস্থা চালায় বলেই এরকম বলা হয়ে থাকে। বস্তুতও তা-ই। জাতিসংঘ বা ইউনাইটেড নেশনস হচ্ছে আন্ত:সরকারি সংস্থা যার লক্ষ্য হল, আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, মানবাধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও পরিবেশ বিষয়ক সমস্যাগুলো প্রতিকারে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা গড়া ও প্রসারিত করা।
ধারনা থেকে স্বপ্ন এবং স্বপ্ন থেকে বাস্তবে রূপ নিতে জাতিসংঘের ৩ বছর লেগেছে। এই বিশ্বসংস্থার সূচনা ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর। জাতিসংঘকে ফলপ্রসূ করে তোলার দায়িত্ব সম্মিলিতভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর। এদিকটা যাদের মাথায় থাকে না সেই নাক উচু, স্বার্থনেশী, হতাশাবাদী প-িত আর বিশেষজ্ঞরা পদেপদে জাতিসংঘের সমালোচনা করেন। বলেন, এ প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ। এ প্রতিষ্ঠান লম্বালম্বা বুলি আওড়ায় আর বৃহৎশক্তির আঙ্গুলিহেলনে ওঠবস করে। এঁরা অভাসে ইঙ্গিতে জাতিসংঘ বিলোপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। কিন্তু জাতিসংঘের বিকল্প কী হবে, তা বলেন না। জানেনই না তা বলবেন কী?
সত্তর বছর ধরেই জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতার দিকগুলো উল্লেখ না করে নেতিবাচক সমালোচনা হয়। কিন্তু গভীর মনোযোগে জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলে এটাই স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, বিশ্ব নাগরিকের সংকট মোচনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘই শেষ নির্ভরতা, তিমির রাত্রিতে পথ দেখানো দৃপ্ত দ্বীপশিখার সঙ্গে তুলনা করা যায় তাকে। এই অনুভবের জন্য জাতিসংঘের মহানতম সাফল্যগুলো দেখবার চোখ থাকা চাই।
খাদ্য সাহায্য, শরনার্থী-ত্রাণ, শিশু সংরক্ষণ, শান্তিরক্ষা, নির্বাচন পরিচালনা, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা, যুদ্ধাপরাধের বিচার, এইডস প্রতিরোধ ও অদৃশ্য সমস্যাগুলো জনসম্মুখে তুলে ধরা ইত্যাদিকে ‘মহানতম সাফল্য’ বলে অভিহিত করতেই হয়।
জনসংখ্যার ভারে কাবু হয়ে পড়া অনেক দেশে খাদ্য সংকট নিয়মিত ব্যাপার। সেটা হতে পারে শান্তিকালে বা যুদ্ধের সময়। এর প্রতিকারে জাতিসংঘের বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি ডাব্লিউ এফপি (ওয়ার্ল্ড ফুড পোগ্রাম) নন্দিত এক উদ্যোগ। প্রতিবছর এই কর্মসূীচর আওতায় ৮০টি দেশের ১০ কোটি ৪০ লাখ মানুষের খাদ্য যোগায় জাতিসংঘ।
উদ্বাস্ত ত্রাণে ১৯৪৯ সালে গঠিত জাতিসংঘের শরনার্থী সংক্রান্ত হাইকমিশনার (ইউএনএইচসি আর) বিশ্বময় প্রশংসিত এক প্রতিষ্ঠান। ইউএনএইচসিআর শান্তিতে নোবেল পুরুস্কার পেয়েছে দু’বার ১৯৫৪ ও ১৯৮১ সালে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ১ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি শরনার্থীকে সহায়তা দিয়েছে। বর্তমানে সিরিয়া, মালি, সুদান ও কঙ্গো থেকে পালানো ৭ লাখ শরনার্থীর দু:খমোচনে কাজ করতে গিয়ে আর্থিক সংকট মোকাবিলা করছে ইউএনএইচসিআর ।
‘ইউনিসেফ কথাটার সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। (ইউনিসেফ) এর সদর নিউইর্য়কে। শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা আর শিশুর জীবনমান উন্নয়নে নিবেদিত ইউনিসেফ ৫ বছর বয়সের নিচের শিশু হত্যা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাৎপর্যময় অবদান রেখে চলেছে। ১৯৯০ সালে এরকম শিশু মারা গিয়েছিল প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ। ২০১১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬৯ লাখ।
গেল ৭০ বছরে জাতিসংঘের সবচেয়ে সফল উদ্যোগ হচ্ছে শান্তি মিশন। আন্তর্জাতিক শান্তি মিশনে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করা এক ধরনের স্বস্তি। বর্তমানে সিরিয়া, কসোভো, উত্তর কোরিয়ার মত হটস্পটগুলোয় ১৬টি শান্তি মিশন সক্রিয় রেখেছে জাতিসংঘ। এর ফলে বহুদেশে যুদ্ধ সংঘাত হানাহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
রাজতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের ভাবাদর্শ কবলিত দেশগুলো জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে চলেছে জাতিসংঘ। স্বৈরাচারী শাসন থেকে গণতান্ত্রিক শাসনে উত্তরণের জন্য অনুষ্ঠেয় নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সর্বাত্মক সহায়তা দেয় জাতিসংঘ। সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে ইরাক। সেদেশে সাদ্দাম উত্তর নতুন সরকার নির্বাচনে কার্যকর সহায়তা দিয়েছে জাতিসংঘ।
শতাধিক দেশে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছে জাতিসংঘ। জনসংখ্যা কমিয়ে আনা, যৌন সংঙ্গমজনিত রোগ-ব্যাধি প্রতিরোধ ইত্যাদিতে অবদান রাখছে এই বিশ্বসংস্থা।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় আনার ব্যবস্থা করা একটি কঠিন প্রক্রিয়া। জাতিসংঘ ইদানীং এই কঠিন কাজটি শুরু করেছে। সাবেক যুগোসøাভিয়া ও রুয়ান্ডার যুদ্ধাপরাধ বিচারে ট্রাইব্যুনাল করেছে। অন্যান্য দেশেও এ ধরনের ট্রাইবুনাল চালনায় ভূমিকা রাখছে।
মরণব্যাধি এইডসের বিরুদ্ধে যেসব প্রতিষ্ঠান লড়াই করছে তাদের নেতা বলা যায় জাতিসংঘকে। এইডস বা এর জীবানু এইচআইভি সম্পর্কে দেশে দেশে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচিতে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউএনএইডস, গ্লোবাল ফা- টু ফাইন্ড এইড বিরামহীন কাজ করেছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, এর ফলে বিশ্বে এইডজনিত রোগীর সংখ্যা ২০০৫ সালের ২৩ লাখ থেকে কমে ২০১২ সালে ১৬ লাখে দাঁড়িয়েছে।
স্থল মাইন, মারবার্গ ফিভার, শিশু-সেনা আধুনিক দাসত্ব এইসব সমস্যা এতকাল জনগণের চোখের আড়ালেই থেকেছে। সাধারণ মানুষ এসব বুঝতোই না, এসব বন্ধের ব্যাপারে গরুত্ব দিতো না। এ ব্যাপারে বিশ্বজনমতকে উদ্ধুদ্ধ করছে জাতিসংঘ। অন্তিমে শান্তিময় বিশ্ব গড়ে তোলার মহান লক্ষ্যেই তার অভিযাত্রা। বিশ্ব নাগরিকরা যদি তার হাত না ধরে, হাত না ভরে, তাহলেই কোন যুক্তিতে তার দ্রুত সাফল্য আশা করি আমরা? আমরা আশা করি আসন্ন জাতিসংঘের ৭০ তম সাধারণ অধিবেশনে জাতিসংঘ আলোচিত বিষয়গুলোতে অধিকতর গুরুত্বআরোপ করবে।






Related News

Comments are Closed