ময়নাতদন্ত সম্পন্ন: মরদেহে মেলেনি কিডনি

চলচ্চিত্র পরিচালক রফিক সিকদারের মা রওশন আরার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মরদেহের ভেতরে কোনো কিডনি পাওয়া যায়নি। তবে মরদেহ থেকে রক্ত ও মস্তিষ্কের কিছু অংশ সংগ্রহ করে হিস্টোপ্যাথলজিতে পাঠানো হবে। সেখানকার রিপোর্ট এলেই মৃত্যুর কারণ জানা যাবে বলে জানাচ্ছেন কর্মকর্তারা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রওশন আরার মৃত্যুর জন্য চিকিৎসকদের দায়ী করে রফিক সিকদার ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহ নেবেন না জানিয়ে দিলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। এ বোর্ডে অপর দুই চিকিৎসক ছিলেন ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক প্রদীপ বিশ্বাস ও কবির সোহেল।

মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে ডা. সোহেল মাহমুদ বাংলানিউজকে জানান, রওশন আরার মরদেহে কোনো কিডনি পাওয়া যায়নি। তবে মরদেহে কয়েকটি ও মাথায় দু’টি টিউমার পাওয়া গেছে।

এ চিকিৎসক আরও জানান, পরীক্ষার জন্য মরদেহ থেকে রক্ত ও মস্তিষ্কের কিছু অংশ সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো হিস্টোপ্যাথলজিতে পাঠানো হবে। সেখানকার রিপোর্ট এলেই মৃত্যুর কারণ বলা যাবে।

বাম পাশের কিডনি জটিলতার কারণে গত ২৬ আগস্ট বিএসএমএমইউতে ভর্তি করানো হয় রওশন আরাকে। তার ছেলে রফিক সিকদারের দাবি, হাসপাতালে বেশ কিছু পরীক্ষা করানোর পর গত ৫ সেপ্টেম্বর অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের চিকিৎসকরা বাম পাশের কিডনি রাখতে চাননি। বাম কিডনি তখন কিছুটা কাজ করছিল। আর ডান পাশের কিডনি পুরোপুরি ভালো ছিল।

রফিক সিকদার বলেন, ‘অপারেশনের পর পোস্ট অপারেটিভে নেওয়ার পর মায়ের জ্ঞান ছিল, কিন্তু শরীর ফুলে যাচ্ছিল। তবে ক্যাথেটার লাগানো থাকার পরও তার প্রস্রাব হচ্ছিল না। দায়িত্বরত চিকিৎসকরাও এটা আমাকে জানিয়েছিল। দুপুরে অপারেশনের পর রাত সাড়ে ৮টার পর বলা হলো, আইসিইউ (নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র) সাপোর্ট লাগবে। কিন্তু তখন বিএসএমএমইউতে আইসিইউ খালি না থাকায় তারা আমাদের বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিতে বলেন। তারা বলেন, রোগীর ইউরিন তৈরি হচ্ছে না। আর বমি হচ্ছিলো।’

পরে রাতেই রোগীকে মগবাজারের ইনসাফ বারাকা হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে সিটিস্ক্যান করার পরামর্শ দিলে ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে তখনই তা করা হয়। কিন্তু সিটিস্ক্যান করানোর পরই ধরা পড়ে রোগীর একটি কিডনিও নেই। এরপর ইনসাফ বারাকা হাসপাতাল থেকে রোগীকে আবার বিএসএমএমইউতে নিতে বলা হয় এবং বিএসএমএমইউতে ডায়ালাইসিস করানো শুরু হয়। ডায়ালাইসিস শুরু হলেও রোগীর বেড়ে যাওয়া ক্রিয়েটিনিন কমছিল না।

জটিলতা বেড়ে গেলে ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের চিফ কনসালট্যান্ট ও কিডনি রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদের কাছে নেওয়া হয় রওশন আরাকে। এই চিকিৎসকও রোগীর কোনো কিডনি নেই বলে নিশ্চিত করেন। তাই আবার রফিক সিকদার তার মাকে বিএসএমএমইউতে ফিরিয়ে আনেন।

কিডনি ‘খোয়া’ যাওয়ার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তখন বিএসএমএমইউ’র ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও রওশন আরার চিকিৎসক হাবিবুর রহমান দুলাল  জানান, ‘অপারেশনের সময় বাম দিকে ইনফেকশন থাকায় রক্তনালি, খাদ্যনালি, কিডনি বোঝা খুব কঠিন হয়ে যায়। প্রচণ্ড রক্তপাত হয়। রক্তপাত বন্ধ হলেও অবস্থা খারাপের দিকে যায় এবং আইসিইউতে নেওয়ার জন্য বলি।’

ডান পাশের কিডনি আছে কি নেই? এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘রিপোর্ট অনুযায়ী নন ভিজ্যুয়ালাইজেশন। এখানে অন্য কোনো অবসেন্ট বা অন্য কিডনি কাজ করছে না। যখন শরীরের কোনো অর্গানের অস্ত্রোপচার করা হয়, তখন দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে থেকে সেখানে ভালোভাবে বোঝা যায় না। তাই আমরা পুনরায় পরীক্ষা করিনি। আমরা আপাতত ডায়ালাইসিস করছি।’

তখন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) এক সংবাদ সম্মেলনে রফিক সিকদার বলেন, ‘মায়ের একটি কিডনিতে অপারেশন করতে গিয়ে ভালো কিডনিও কেটে ফেলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোলজি বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক হাবিবুর রহমান দুলাল। পরে এই অপরাধ তিনি লিখিতভাবে স্বীকার করে নিয়ে আমাদের সঙ্গে চুক্তি করেছেন যে, তিনি নিজ খরচে কিডনি প্রতিস্থাপন করবেন। কিন্তু ডাক্তার হাবিবুর রহমান কালক্ষেপণ করে সময় নষ্ট করছেন। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের আইসিইউ-এর লাইফ সাপোর্টে কোমায় পড়ে আছে আমার অসহায় মায়ের নিথর দেহ। হাসপাতালের কয়েকজন ডাক্তারের কাছে জানতে পেরেছি তিনি ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’।

সংবাদ সম্মেলনে পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘বিএসএমএমইউ’র ডাক্তার হাবিবুর রহমান দুলাল আমাদের এই পরিচালক সমিতিতে এসে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে সই দিয়ে গিয়েছিলেন যে, রফিক সিকদারের মায়ের কিডনির ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। যত টাকা লাগে তিনি তাকে সুস্থ করে তুলবেন। রফিকের খালা কিডনি দিতে রাজি হলে তিনি যাবতীয় খরচ বহনের মাধ্যমে লিখিত দিয়ে যান গত ১ অক্টোবর। কিন্তু সবকিছু বলে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি এবং কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।’

শেষে বিএসএমএমইউর আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩১ অক্টোবর রাতে মারা যান রওশন আরা।

তার মৃত্যুর পর রফিক সিকদার তার ফেসবুকে লেখেন, ‘পাষাণ ডাক্তারের নির্মমতার কাছে জীবনযুদ্ধে হেরে গেছেন আমার মা। আমাদের ছয় ভাইবোনকে বিচারহীনতার নরকে ফেলে রেখে অভিমানে এইমাত্র ওপারে চলে গেলেন আমার মা।’

রওশন আরার মৃত্যুর পর সঠিক ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহ নেবেন না জানিয়ে রফিক সিকদার বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমি বিএসএমএমইউ থেকে মায়ের লাশ গ্রহণ করিনি। ময়না-তদন্ত করতে হবে এবং ময়না তদন্ত সঠিক হতে হবে। মায়ের দুই কিডনি হারানোর কারণে বা অপ-চিকিৎসায় তিনি মারা গেছেন। সেটা ডেথ রিপোর্টে আসতে হবে। নইলে লাশতো নেবোই না, বরং আইনি প্রক্রিয়া মামলা করে বিচার চাইবো আমি। বিএসএমএমইউর কয়েকজন চিকিৎসক আমার মায়ের এ অবস্থার জন্য দায়ী। আমি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবো। যেন চিকিৎসকের অসতর্কতায় আর কোনো সন্তান তার মাকে না হারায়।’

কিডনি খোয়া যাওয়ার পরই এ ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়। সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বাংলানিউজকে জানান, তদন্ত প্রতিবেদন এলেই আসল ঘটনা জানা যাবে।

সার্বিক বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান বাংলানিউজকে তিনি বলেন, যেহেতু একটা হাসপাতালের কয়েকজন প্রফেসরের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়েছে, সেহেতু বিষয়টি প্রাথমিকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ হলে মামলা দায়ের করা হবে।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.